অলঙ্করণ: tuput
বাংলা
ইসরো আদিত্য-এল১ উৎক্ষেপণ করে ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর, আর ২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি সেটিকে বসায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরের এক মহাকর্ষীয় ভারসাম্য-বিন্দুর চারপাশের কক্ষপথে। ভারতে তৈরি সাতটি যন্ত্র তারপর থেকে নিকট অতিবেগুনি আলোয় সূর্যের ছবি তুলেছে, একটি করোনাল ম্যাস ইজেকশনের সূচনা ধরেছে, আর নথিবদ্ধ করেছে ২০২৪ সালের মে মাসের ঝড়।
২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর সকাল ১১.৫০-এ শ্রীহরিকোটার দ্বিতীয় উৎক্ষেপণ-মঞ্চ থেকে একটি পিএসএলভি রকেট আকাশে ওঠে। ইসরোর উৎক্ষেপণ-বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৬৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডের উড়ানের পর মহাকাশযানটি পৃথিবীকে ঘিরে ২৩৫ বাই ১৯,৫০০ কিলোমিটারের একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ছিল, আর গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগবে প্রায় ১২৭ দিন।
মহাকাশযানটির নাম আদিত্য-এল১, সূর্যকে অধ্যয়ন করার জন্য ভারতের তৈরি প্রথম মহাকাশ মানমন্দির। মিশন কন্ট্রোল রুমে মহাকাশ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং উৎক্ষেপণকে বলেন ‘ভারতের জন্য একটি রৌদ্রোজ্জ্বল মুহূর্ত’। তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ‘হিসাব-নিকাশের দিন’।
১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরের একটি পার্কিং-জায়গা
আদিত্য-এল১ ঘুরছে মহাশূন্যের একটি ফাঁকা বিন্দুকে, যার নাম এল১, সূর্য-পৃথিবী ব্যবস্থার প্রথম ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু। নাসা ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুকে বর্ণনা করে এমন অবস্থান হিসেবে, যেখানে পাঠানো বস্তু সাধারণত স্থির থাকে, কারণ দুটি বিশাল ভরের অভিকর্ষ টান ঠিক ততটা, যতটা বল দরকার একটি ছোট বস্তুকে তাদের সঙ্গে নিয়ে চলার জন্য। নাসার পাতায় আরও আছে, এল১ থেকে সূর্য দেখা যায় অবিচ্ছিন্নভাবে, আর সেখানেই আছে সোলার অ্যান্ড হেলিওস্ফেরিক অবজারভেটরি, সোহো। সেখানে আরও বলা হয়েছে, এল১ অস্থির প্রায় ২৩ দিনের সময়মাপে, তাই সেখানকার উপগ্রহগুলোর গতিপথ নিয়মিত শুধরে দিতে হয়।
এল১ পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে, ট্রিবিউনের হিসাবে যা পৃথিবী আর সূর্যের মধ্যেকার দূরত্বের প্রায় ১ শতাংশ। ইসরো আদিত্য-এল১-কে ঠিক বিন্দুটিতে বসায়নি। মহাকাশযানটিকে রাখা হয়েছে একটি হ্যালো কক্ষপথে, অর্থাৎ বিন্দুটিকে ঘিরে একটি বড় পাক-খাওয়া পথে। ইসরো বলছে, এই কক্ষপথে পাঁচ বছরের অভিযান-আয়ু মেলে, অথচ কক্ষপথ ধরে রাখার কৌশল, ফলে জ্বালানি খরচ, থাকে ন্যূনতম। একটি পাক ঘুরতে লাগে প্রায় ১৭৭.৮৬ পৃথিবী-দিন। ইসরোর হিসাবে, হ্যালো কক্ষপথের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিস্তার তিন অক্ষ বরাবর ২,০৯,২০০ কিমি, ৬,৬৩,২০০ কিমি আর ১,২০,০০০ কিমি।
এল১-কে ঘিরে হ্যালো কক্ষপথের উপগ্রহ সূর্যকে দেখে গ্রহণ বা আড়াল ছাড়াই, পিআইবির উৎক্ষেপণ-দিনের বিজ্ঞপ্তি বলছে, ফলে সৌর কার্যকলাপ আর মহাকাশের আবহাওয়ায় তার প্রভাব রিয়েল টাইমে নজরে রাখা যায়।
পৌঁছতে লাগল একশো ছাব্বিশ দিন
আদিত্য-এল১ পৃথিবী থেকে সরে গেছে ধাপে ধাপে। ট্রিবিউনের প্রকাশ করা সময়সূচি অনুযায়ী, ৩, ৫, ১০ ও ১৫ সেপ্টেম্বরের ইঞ্জিন-চালনায় তার পৃথিবী-কক্ষপথ প্রথমে হয় ২৪৫ বাই ২২,৪৫৯ কিমি, তারপর ২৮২ বাই ৪০,২২৫ কিমি, তারপর ২৯৬ বাই ৭১,৭৬৭ কিমি, তারপর ২৫৬ বাই ১,২১,৯৭৩ কিমি। ৩০ সেপ্টেম্বর সে পৃথিবীর প্রভাবক্ষেত্র, অর্থাৎ যে এলাকায় পৃথিবীর অভিকর্ষই প্রধান, ছেড়ে বেরিয়ে এল১-এর দিকে রওনা দেয়। ইসরোর বিবরণে এই যাত্রা চলেছিল আনুমানিক ১১০ দিন, আর তাতে ছিল দুটি গতিপথ-সংশোধন, ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর ও ১৪ ডিসেম্বর।
২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি ভারতীয় সময় বিকেল ৪টে নাগাদ আদিত্য-এল১ তার নিয়ন্ত্রণ-ইঞ্জিন অল্প সময় চালিয়ে হ্যালো কক্ষপথে ঢোকে। উৎক্ষেপণের আগে ইসরো বলেছিল যাত্রায় লাগবে প্রায় ১২৭ দিন। কক্ষপথে ঢোকা সম্পূর্ণ হলো উৎক্ষেপণের ১২৬ দিন পরে। সেদিন সন্ধ্যার পিআইবি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই প্রবেশে দরকার ছিল ‘নিখুঁত দিকনির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ’। ট্রিবিউনের মতে, শেষ ধাপের দায়িত্বে ছিল ইসরোর বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক ইস্ট্র্যাক, যা মহাকাশযানের ওপর নজর রেখে তার গতি আর অবস্থান ঠিক করেছে নিজের থ্রাস্টার দিয়ে।
ইসরো চেয়ারম্যান এস. সোমনাথ সাংবাদিকদের বলেন: ‘এটা ছিল একটা জটিল অভিযান, আমি চ্যালেঞ্জিং অভিযান বলব না। চ্যালেঞ্জ আমরা ভালোবাসি, জটিলতা এমন জিনিস যাকে আমাদের পেরিয়ে যেতে হয়। আজ আমরা সেই জটিলতা পেরিয়েছি, আর নিখুঁতভাবেই তা করতে পেরেছি।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্সে লেখেন, তিনি দেশের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন ‘এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য অভিনন্দন জানাতে’। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দলে নারী প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীর বড় সংখ্যাটি উল্লেখ করেন, আর ট্রিবিউন জানায়, প্রকল্প-অধিকর্তা নিগার শাজি একজন নারী।
সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা চারটি যন্ত্র
আদিত্য-এল১ বহন করে সাতটি পেলোড। চারটি সূর্যের দিকে তাক-করা দূর-সংবেদী যন্ত্র, আর তিনটি মাপে মহাকাশযানের গায়ে যা এসে পৌঁছয়। উৎক্ষেপণের আগের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ যন্ত্র-দলগুলোর একটি গবেষণাপত্র, যার নেতৃত্বে পুনের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (আইউকা) দুর্গেশ ত্রিপাঠী। এই অংশের আর পরের অংশের বেশিরভাগ সংখ্যা সেখান থেকে নেওয়া।
VELC, ভিজিবল এমিশন লাইন করোনাগ্রাফ, টেলিস্কোপের ভেতরেই সূর্যের উজ্জ্বল চাকতিকে আড়াল করে দেয়, যাতে করোনা, অর্থাৎ সূর্যের পাতলা বাইরের বায়ুমণ্ডল, চোখে পড়ে। এর প্রবেশ-ছিদ্র ১৪৮ মিলিমিটার। এটি করোনার ছবি তোলে সাদা আলোয়, সৌর ব্যাসার্ধের ১.০৫ থেকে ৩.০ গুণ পর্যন্ত, আর তিনটি নিঃসরণ-রেখায় চালায় একটি স্পেকট্রোগ্রাফ। এর নির্মাতারা বলছেন, ১০৭৪.৭ ন্যানোমিটারের রেখাটির লক্ষ্য ‘মহাকাশ থেকে প্রথমবার’ করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রের গঠন-চিত্র দেওয়া। ভেতরের করোনা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তাও তাঁরা বুঝিয়েছেন। সোহোর আগেকার করোনাগ্রাফ করোনাল ম্যাস ইজেকশন, অর্থাৎ মহাশূন্যে ছুড়ে-দেওয়া সৌর প্লাজমার মেঘ, অনুসরণ করতে পারত কেবল ২.৫ সৌর ব্যাসার্ধের বাইরে। গবেষণাপত্রটি একটি সমীক্ষার উল্লেখ করেছে, যার সিদ্ধান্ত: সিএমই-র ত্বরণের ৯০ শতাংশ ঘটে ২ সৌর ব্যাসার্ধের নিচে।
SUIT, সোলার আল্ট্রাভায়োলেট ইমেজিং টেলিস্কোপ, একটি রিচি-ক্রেতিয়েঁ প্রতিফলক, যার প্রাথমিক দর্পণ ১৪০ মিলিমিটারের, আর আছে ২০০ থেকে ৪০০ ন্যানোমিটারের মধ্যে ১১টি বৈজ্ঞানিক ফিল্টার। এর পিক্সেলের প্রস্থ ০.৭ আর্কসেকেন্ড, আর অবস্থাভেদে ৪ থেকে ৪০ সেকেন্ডে একটি করে ছবি তুলতে পারে। আগ্রহের এলাকা সে নিজেই অনুসরণ করে, আর ফ্লেয়ার দেখার সময় এক্সপোজার নিজে থেকে বদলে নেয়। এই তরঙ্গ-পরিসর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে শোষিত হয়ে যায়, তাই মহাকাশের টেলিস্কোপ ছাড়া তা দেখা যায় না। আইউকা বলছে, পেলোডটির ভাবনা ২০১৩ সালে, আর ইসরোকে সেটি জমা দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ৬ জুন।
দুটি এক্স-রে যন্ত্র সূর্যকে দেখে একটিমাত্র আলোর বিন্দু হিসেবে। SoLEXS, সোলার লো এনার্জি এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার, ধরে ১ থেকে ৩০ কিলো-ইলেকট্রনভোল্ট (keV) পরিসরের নরম এক্স-রে, যা ফ্লেয়ারের তাপ বয়ে আনে। এতে আছে দুটি অভিন্ন ডিটেক্টর, ছিদ্রের মাপ আলাদা, একটি ছোট ফ্লেয়ারের প্রতি সংবেদনশীল আর একটি বড়গুলোর প্রতি, এবং ফ্লেয়ারের সময় প্রতি সেকেন্ডে একটি করে বর্ণালি তৈরি করতে পারে। ফ্লেয়ারের শুরুও সে যানের ভেতরেই ধরে ফেলে আর সংকেতটি পাঠিয়ে দেয় SUIT-কে। HEL1OS, হাই এনার্জি এল১ অরবিটিং এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার, ধরে ১০ থেকে ১৫০ keV পরিসর, ক্যাডমিয়াম জিংক টেলুরাইড আর ক্যাডমিয়াম টেলুরাইড ডিটেক্টর দিয়ে। তার লক্ষ্য ফ্লেয়ারের হঠাৎ-জ্বলে-ওঠার ধাপ, যখন বেশির ভাগ বিকিরণই অতাপীয়, মানে তা আসে ত্বরান্বিত কণা থেকে, উত্তপ্ত গ্যাস থেকে নয়। দুটি মিলে ১ থেকে ১৫০ keV পরিসর ঢাকা পড়ে।
যে তিনটি যন্ত্র পৌঁছনো কণার নমুনা নেয়
তিনটি যন্ত্র সূর্যের দিকে মোটেই তাকায় না। তারা বসে আছে এল১-এ এসে পৌঁছনো কণা আর চৌম্বক ক্ষেত্রের স্রোতের মধ্যে।
ASPEX, আদিত্য সোলার উইন্ড পার্টিকল এক্সপেরিমেন্টে আছে দুটি আয়ন স্পেকট্রোমিটার। একটির নাম SWIS, পরিসর ০.১ থেকে ২০ keV। অন্যটি STEPS, পরিসর প্রতি নিউক্লিয়নে ২০ keV থেকে প্রতি নিউক্লিয়নে ৫ MeV, আর সে দেখে ছয় দিকে, সরাসরি সূর্যের দিকে এবং পার্কার সর্পিল বরাবরও, যা সৌর বায়ুর বাঁকানো পথ। PAPA, প্লাজমা অ্যানালাইজার প্যাকেজ ফর আদিত্য, মাপে ০.০১ থেকে ৩ keV-এর সৌর বায়ুর ইলেকট্রন আর ০.০১ থেকে ২৫ keV-এর আয়ন, আর তার আয়ন-সেন্সর চিনতে পারে ১ থেকে ৬০ পারমাণবিক ভরের এককের মৌলকে।
MAG, ম্যাগনেটোমিটার, একটি বুমের ওপর দুটি ফ্লাক্সগেট সেন্সর ব্যবহার করে, কারণ মহাকাশযান নিজে চৌম্বকভাবে পরিচ্ছন্ন নয়। ইসরোর মতে, ৬ মিটারের কার্বন-ফাইবার বুমটি খোলা হয়েছে ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি, উৎক্ষেপণের পর ১৩২ দিন ভাঁজ করা থাকার পর। সেন্সর দুটি যানের গা থেকে ৩ আর ৬ মিটার দূরে, আর দুটির তুলনা করে বিজ্ঞানীরা মহাকাশযানের নিজের ক্ষেত্র বাদ দিতে পারেন। বুমে আছে পাঁচটি খণ্ড, একটি কেভলারের নিয়ন্ত্রণ-লুপ আর তাপীয় কাটার, যা নির্দেশ পেলে সেটি ছেড়ে দেয়। ইসরোর মাপে খুলতে সময় লেগেছে আনুমানিক ৯ সেকেন্ড, পূর্বাভাসের ৮ থেকে ১২ সেকেন্ডের মধ্যেই।
প্রথম ছবিগুলো
SUIT চালু হয় ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর। ৬ ডিসেম্বর সে প্রথম বৈজ্ঞানিক ছবি তোলে, আর আইউকার উদ্ধৃতি অনুযায়ী তার মুখ্য গবেষক দুর্গেশ ত্রিপাঠী বলেন: ‘একজন বিজ্ঞানীর কাছে এ এক জীবনে একবারের সুযোগ, এমন জটিল মহাকাশ-টেলিস্কোপ পেলোডের ভাবনা করা, আর তারপর তার প্রথম আলোর পর্যবেক্ষণ দেখতে পাওয়া। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এই সমন্বয়ে সূর্যের পূর্ণ চাকতির ছবি কোনো মহাকাশ-টেলিস্কোপ তুলছে এই প্রথমবার।’
২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে ইসরো জানায়, এগারোটি ফিল্টারে তোলা ছবিগুলো ২০০ থেকে ৪০০ ন্যানোমিটারের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সূর্যের প্রথম পূর্ণ-চাকতির ছবি, কেবল একটি ক্যালসিয়াম রেখা বাদে, যা অন্য মানমন্দির আগেই ধরেছিল। Mg II h ছবিটিতে চিহ্নিত আছে সূর্যকলঙ্ক, প্লাজ (সক্রিয় এলাকার চারপাশের উজ্জ্বল ছোপ) আর শান্ত সূর্যের অঞ্চল। আইউকা বলছে, প্রথম দফায় তিনটি ফিল্টার চালানো হয়, বাকিগুলো তারপর পরীক্ষা হয় এবং ভালো ছবি দেয়।
২০২৪ সালের মে মাসের ঝড়
২০২৪ সালের মে মাসের শুরুতে এআর১৩৬৬৪ নামে চিহ্নিত একটি সক্রিয় এলাকা পৃথিবীর দিকে ছুড়ে দেয় এক্স-শ্রেণির একের পর এক ফ্লেয়ার আর করোনাল ম্যাস ইজেকশন। ১৪ মের বিবরণে ইসরো এর ফলে ঘটা ভূচৌম্বকীয় ঝড়কে বলেছে ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে তীব্র, যার ডিএসটি সূচক মাইনাস ৪১২ ন্যানোটেসলা, গ্রহীয় কেপি সূচক ৯, যা সর্বোচ্চ, আর ফ্লেয়ারের শ্রেণি এক্স৫.৮।
আদিত্য-এল১ তা দেখেছে এল১ থেকে। ASPEX-এর SWIS সৌর বায়ুতে আলফা কণা আর প্রোটনের প্রবাহ বেড়ে যেতে দেখে, আর STEPS পুরো ঘটনার সময় শক্তিশালী আয়নের টানা বৃদ্ধি ধরে রাখে। SoLEXS ও HEL1OS নরম ও কড়া এক্স-রে-তে নথিবদ্ধ করে একাধিক এক্স ও এম শ্রেণির ফ্লেয়ার, আর MAG নথিবদ্ধ করে আন্তঃগ্রহ চৌম্বক ক্ষেত্রের বিঘ্ন। চন্দ্রযান-২-এর এক্স-রে মনিটর চাঁদের কক্ষপথ থেকে একই ঘটনাগুলো ধরেছে।
ভারতের মাটিতে আর তার ওপরের আকাশে কী ঘটেছিল, তা একই বিবরণে আছে। আয়নমণ্ডলের একটি মাপ, মোট ইলেকট্রন সংখ্যা, ১০ মের মধ্যরাত থেকে ১১ মের সকালের মধ্যে গাদাঙ্কির ওপর কমেছিল ৫০ শতাংশের বেশি, আর থুম্বার ওপর পৌঁছেছিল প্রায় ৮০ টিইসিইউ-তে, ওই সময়ের স্বাভাবিক ১০ থেকে ২০-এর জায়গায়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ইসরোর ৩০টি ভূস্থির মহাকাশযানের কোনোটিতে বড় গোলযোগ হয়নি, ইসরোর ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহগুলোর মধ্যে যেগুলো তার গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে দেখা যায়, তাদের কোনোটিতে গোলযোগ বা ল্যাচ-আপ হয়নি, আর নাভিক নেভিগেশন পরিষেবায় প্রভাব পড়েনি বা নগণ্য। নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে বাড়তি টান মাপা গেছে: প্রায় ৪৩০ কিমি উচ্চতার ইওএস-০৭ ১১ মে কক্ষপথের উচ্চতা হারায় ৬০০ মিটার, স্বাভাবিক ৩০০ মিটারের জায়গায়।
ফ্লেয়ারের কার্নেল থেকে লোহার দ্যুতি
এরপর এসেছে গবেষণাপত্র। ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি SUIT একটি এক্স৬.৩ ফ্লেয়ার দেখে। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির বিজ্ঞপ্তিতে ইসরো জানায়, SUIT ফোটোস্ফিয়ার আর ক্রোমোস্ফিয়ারে, অর্থাৎ সূর্যের নিচের বায়ুমণ্ডলে, নিকট অতিবেগুনি আলোয় সৌর ফ্লেয়ারের একটি ‘কার্নেলের’ প্রথম ছবি তুলেছে। ফোটোস্ফিয়ার দেখতে পায় এমন ফিল্টারে দুটি উজ্জ্বল কার্নেল ধরা পড়ে, যার মানে ফ্লেয়ারটি পৌঁছেছিল ক্রোমোস্ফিয়ারের নিচের স্তরেও। নিচের বায়ুমণ্ডলের এই উজ্জ্বলতা বাড়ার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল করোনার প্লাজমার তাপমাত্রা বাড়া। ফলটি ছাপা হয় দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই VELC একটি করোনাল ম্যাস ইজেকশনের সূচনা দেখে ৫৩০৩ অ্যাংস্ট্রমের সবুজ রেখা দিয়ে, যা করোনার তাপমাত্রায় লোহার পরমাণু থেকে বেরোনো আলো। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের গবেষকেরা দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে জানান, উৎস-অঞ্চলের কাছে করোনা প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে প্রায় ৫০ শতাংশ ম্লান হয়েছিল, রেখাটি চওড়া হয়েছিল প্রায় ১৫ শতাংশ, আর প্লাজমায় দেখা গিয়েছিল সেকেন্ডে প্রায় ১০ কিলোমিটারের লালসরণ-যুক্ত ডপলার গতি। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাইয়ের সংসদীয় উত্তরে সরকার অভিযানের প্রধান সাফল্যগুলোর মধ্যে রেখেছে ‘একটি করোনাল ম্যাস ইজেকশনের সূচনা-ধাপের প্রথম বর্ণালিগত চিহ্ন’, কোন যন্ত্রের কথা, তা না বলে।
ইসরো তথ্য খুলে দিয়েছে সবার জন্য। কক্ষপথে ঢোকার এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি, বেঙ্গালুরুতে ইসরোর সদর দপ্তরে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের ৪০ জন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও ছাত্রের সামনে সোমনাথ সাতটি যন্ত্রেরই প্রথম ডেটাসেট প্রকাশ করেন। ডেটা আছে ইসরোর PRADAN পোর্টালে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তৃতীয় দফার অ্যানাউন্সমেন্ট অব অপরচুনিটি ভারতীয় গবেষকদের আমন্ত্রণ জানায় VELC আর SUIT দিয়ে পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব দিতে।
২০২৬ সালেও ফল আসতে থাকে। ৩ জুলাই ইসরো জানায়, ২০২৪ সালের ৪৭টি এক্স-শ্রেণির ফ্লেয়ারে SoLEXS ধরেছে ফোটোস্ফিয়ারের লোহার প্রতিপ্রভা, অর্থাৎ ফ্লেয়ারের এক্স-রে সূর্যের পৃষ্ঠের নিরপেক্ষ লোহার পরমাণুতে আঘাত করলে ৬.৪০ keV-এ যে দ্যুতি তৈরি হয়। গবেষণাপত্র ছাপা হয় সোলার ফিজিক্সে। চাকতির মাঝামাঝি ফ্লেয়ারে প্রতিপ্রভা জোরালো, কিনারার কাছে চাপা, যা তত্ত্বের সঙ্গে মেলে। ২৩ জুলাইয়ের সংসদীয় উত্তর আরও জানায়, ২০২৪ সালের মে ও অক্টোবরের তীব্র ভূচৌম্বকীয় ঝড় বুঝতে বিজ্ঞানীরা মাটির ওপরের মাপজোখ আর আদিত্য-এল১-এর কণা ও ক্ষেত্রের পর্যবেক্ষণ মিলিয়েছেন। একটি বিষয়ে উত্তরটি সতর্ক: আদিত্য-এল১ ‘একটি সৌর পদার্থবিদ্যার অভিযান, মহাকাশ-আবহাওয়ার অভিযানের শ্রেণিতে পড়ে না’।
অভিযানের খরচ
এই লেখায় ব্যবহৃত ইসরোর কোনো পাতাতেই খরচের অঙ্ক নেই। কক্ষপথে ঢোকার দিন পিআইবি জানায়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেছেন অভিযানটি ‘শুধু দেশীয় নয়, খুবই কম খরচেরও’, আর ‘বাজেট মাত্র ৬০০ কোটি টাকা’। উৎক্ষেপণের সময় আউটলুক বিজনেস জানায়, ইসরো কোনো অঙ্ক দেয়নি, আর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে তা ৩.৭৮ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ৩৭৮ কোটি টাকা। সংখ্যা দুটি আলাদা, আর এই ফারাকের কোনো প্রকাশিত ব্যাখ্যা tuput খুঁজে পায়নি।
চন্দ্রযান-৩-এর পরে এর জায়গা
উৎক্ষেপণের দশ দিন আগে চন্দ্রযান-৩ চাঁদে নেমেছিল। ২০২৩ সালের ২৩ আগস্টের ইসরোর অভিযান-লগে লেখা: ‘চন্দ্রযান-৩ সফলভাবে চাঁদে সফট-ল্যান্ডিং করেছে।’ ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি সংসদীয় উত্তর বলছে, চাঁদের মেরু অঞ্চলে এ পর্যন্ত একমাত্র সফল অভিযান চন্দ্রযান-৩। ইসরোর দীর্ঘতর ইতিহাস বলা আছে ইসরো নিয়ে tuput-এর একটি আগের লেখায়, আর এই খাতে এখন যে বেসরকারি কোম্পানিগুলো আসছে, তাদের কথা আরেকটিতে।
২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পিআইবি মন্ত্রীর এক্স-পোস্ট উদ্ধৃত করে, ‘চাঁদে হাঁটা থেকে সূর্যের নাচে!’, এবং আদিত্য-এল১-কে বর্ণনা করে ইসরোর পরপর তিনটি সাফল্যের তৃতীয়টি হিসেবে, চন্দ্রযান-৩ ও এক্সপোস্যাটের পরে। ২০২৬ সালের সংসদীয় উত্তর বলছে, আদিত্য-এল১-এ হ্যালো কক্ষপথ ধরে রাখা আর পেলোড নিজে থেকে চালানোর যে শিক্ষা মিলেছে, তা কাজে লাগছে শুক্র অরবিটার অভিযানের পরিকল্পনায়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইসরোর ডাকা পর্যবেক্ষণ-প্রস্তাবের তৃতীয় দফায় অনুমোদিত VELC আর SUIT-এর পর্যবেক্ষণের সময়সূচি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬।
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
- ISRO: PSLV-C57/Aditya-L1 Mission press release
- ISRO: Aditya-L1 Halo-Orbit Insertion, 6 January 2024
- PIB: Sunshine moment for India, says Dr Jitendra Singh as PSLV-XL launches India's first Solar Mission (2 September 2023)
- PIB: From Moonwalk to Sun Dance, Dr Jitendra Singh lauds successful insertion of Aditya-L1 to Halo Orbit (6 January 2024)
- The Tribune: Sunshine moment, ISRO puts Aditya-L1 in halo orbit to study sun dynamics
- NASA Science: What is a Lagrange point?
- Tripathi et al.: The Aditya-L1 mission of ISRO (IAU Symposium 372 proceedings, 2022)
- ISRO: Successful Deployment of Magnetometer Boom on Aditya-L1 in Halo Orbit
- IUCAA: Aditya-L1's SUIT captures first light images
- ISRO: ISRO Captures the Signatures of the Recent Solar Eruptive Events from Earth, Sun-Earth L1 Point, and the Moon (14 May 2024)
- ISRO: Historic First, SUIT onboard Aditya-L1 captures unprecedented solar flare details (28 February 2025)
- ISRO: Aditya-L1's observations of a coronal mass ejection (10 December 2024)
- ISRO: National meet on Aditya-L1 data release and payload performance appraisal (7 January 2025)
- ISRO: Iron fluorescence on the Sun during massive solar flares, Aditya-L1 observation (3 July 2026)
- PIB: Parliament question, achievements of Aditya-L1 mission (23 July 2026)
- ISRO: Aditya-L1 Announcement of Opportunity, third cycle (July 2026)
- Outlook Business: How much cost and effort India's first solar mission Aditya-L1 took (5 September 2023)
- ISRO: Chandrayaan-3 mission updates
এই লেখাটি AI সরঞ্জামের সহায়তায় গবেষণা ও রচনা করা হয়েছে এবং নির্ভুলতার জন্য সম্পাদনা করা হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ তথ্য ও আলোচনার জন্য, পেশাদার পরামর্শ নয়। আমাদের সম্পাদকীয় মান ও দাবিত্যাগ দেখুন। কোনো ভুল চোখে পড়ল? আমাদের জানান।
ভালো লাগল? পরেরটিও পড়ুন।
একবারে একটি ভালো লেখা, সরাসরি আপনার ইনবক্সে। কোনো স্প্যাম নয়, যখন খুশি বন্ধ করতে পারেন।