অলঙ্করণ: tuput
বাংলা
২৬ বছর বয়সী সাহা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। তাপীয় আয়নীকরণ নিয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধটি তিনি ১৯২০ সালের ৪ মার্চ Philosophical Magazine-এ পাঠান। তাতে নক্ষত্রের বর্ণালির রেখা থেকে তাপমাত্রা বের করা সম্ভব হয়, আর সিসিলিয়া পেইন ১৯২৫ সালের গবেষণাপত্রে তা কাজে লাগান। নোবেল আর্কাইভে ১৯৩০ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে তাঁর সাতটি মনোনয়ন আছে।
সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ বলে দেয়, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চাপে কোনো উত্তপ্ত গ্যাসের কত অংশ পরমাণু একটি ইলেকট্রন হারিয়েছে। জ্যোতির্বিদরা এর সাহায্যে নক্ষত্রের আলোর কালো রেখাগুলো থেকে তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বের করেন। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার মেঘনাদ সাহা এ নিয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধটি ১৯২০ সালের ৪ মার্চ Philosophical Magazine-এ পাঠিয়েছিলেন। এ কথা জানিয়েছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের পদার্থবিদ অর্ণব রায় চৌধুরী, যাঁর হিসাবে তখন সাহার বয়স ২৬।
নোবেল পুরস্কারের আর্কাইভে সাহা ১৯৩০ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে সাতবার মনোনীত, আর তিনি কখনো পুরস্কার পাননি। তাঁর গল্পে দুটি বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে: সমীকরণটি প্রথম কে লিখেছিলেন, আর নোবেল কমিটি কেন তাঁকে বাদ দিয়েছিল। নিচে প্রতিটির পাশে দাবিদারের নাম দেওয়া আছে।
যে লেকচারারের কোনো গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ছিল না
রায় চৌধুরী লিখেছেন, সাহা জন্মেছিলেন ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর, ঢাকার কাছে সেওড়াতলী গ্রামে, এক ছোট মুদির দোকানির ছেলে হয়ে। তিনি ১৯১১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন, ১৯১৩ সালে বিএসসি আর ১৯১৫ সালে এমএসসি পাস করেন। তাঁর সহপাঠী সত্যেন্দ্রনাথ বসু দুটি পরীক্ষাতেই প্রথম হয়েছিলেন, সাহা দ্বিতীয়।
বাংলাপিডিয়া বলছে, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ১৯১৬ সালে তাঁকে কলকাতার নতুন সায়েন্স কলেজে লেকচারার নিযুক্ত করেন। জ্যোতির্বিদ এইচ এইচ প্লাসকেটকে লেখা পরবর্তী এক চিঠিতে (রায় চৌধুরী যা উদ্ধৃত করেছেন) সাহা জানান, ১৯১৭ সালে তাঁকে পড়াতে দেওয়া হয়েছিল এলোমেলো কয়েকটি বিষয়: তাপগতিবিদ্যা, বর্ণালিবিজ্ঞান আর পৃথিবীর আকৃতি। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার যা হাতের কাছে পেতেন তা-ই পড়তেন, তার মধ্যে ছিল অ্যাগনেস ক্লার্কের সূর্য ও নক্ষত্র নিয়ে দুটি বই। রায় চৌধুরীর যুক্তি, এই ছড়ানো পড়াশোনাই তাঁকে এমন তিনটি ক্ষেত্র জোড়া লাগাতে সাহায্য করেছিল যেগুলোকে বিশেষজ্ঞরা আলাদা করে রাখতেন: রাসায়নিক সাম্যের তত্ত্ব, পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা, আর নাক্ষত্রিক বর্ণালিবিজ্ঞান।
সূর্যের কিনারার ধাঁধা
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য সূর্যের চাকতি ঢেকে দেয়, আর পৃষ্ঠের ঠিক ওপরের পাতলা গ্যাস নিজের আলো দেখাতে শুরু করে। সেই স্তরের নাম বর্ণমণ্ডল, আর তার আলোকে বলা হয় ফ্ল্যাশ বর্ণালি। রায় চৌধুরী বলছেন, এর উজ্জ্বল রেখাগুলো প্রায়ই সাধারণ সূর্যালোকের কালো রেখাগুলো থেকে বেশ আলাদা জায়গায় পড়ত, আর কেউ তার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না।
ক্যালসিয়াম ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। সাধারণ সূর্যালোকে নিরপেক্ষ ক্যালসিয়ামের একটি কালো রেখা আছে ৪২২.৭ ন্যানোমিটারে, আর একটি ইলেকট্রন-হারানো ক্যালসিয়ামের দুটি রেখা আছে, H আর K রেখা, ৩৯৬.৯ ও ৩৯৩.৪ ন্যানোমিটারে। উঁচু বর্ণমণ্ডলে নিরপেক্ষ রেখাটি অনুপস্থিত ছিল আর H ও K রেখা অনেক বেশি জোরালো। জ্যোতির্বিদরা তখন ভাবতেন ওই স্তর সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়ে ঠান্ডা, যার অর্থ আয়নীকরণ কম হওয়ার কথা, বেশি নয়।
সাহা একটি পরমাণু থেকে ইলেকট্রন ছাড়িয়ে নেওয়াকে দেখলেন এমন এক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো, যা একটি ভারসাম্যে এসে থিতু হয়। তিনি দেখালেন, এই ভারসাম্য শুধু তাপমাত্রার ওপর নয়, চাপের ওপরও নির্ভর করে। উচ্চতা বাড়লে চাপ কমে, তাই উচ্চতার সঙ্গে আয়নিত ক্যালসিয়ামের অংশ বাড়ে, আর উঁচু বর্ণমণ্ডলে নিরপেক্ষ ক্যালসিয়াম প্রায় থাকেই না। হিসাবটা সংখ্যায় ফেলতে তাঁর দরকার ছিল প্রতিটি মৌল থেকে ইলেকট্রন ছাড়াতে কত শক্তি লাগে, যা তিনি নিয়েছিলেন ফ্রাঙ্ক ও হার্টজ, ম্যাকলেনান এবং অন্যদের মাপা আয়নীকরণ বিভবের মান থেকে। প্রবন্ধটির নাম “Ionisation in the solar chromosphere”, ছাপা হয়েছিল Philosophical Magazine-এর ৪০তম খণ্ডে, ৪৭২ পৃষ্ঠা থেকে।
ক্যালসিয়ামের রেখা থেকে তাপমাত্রার মাপকাঠি
হার্ভার্ডের জ্যোতির্বিদরা নক্ষত্রদের বর্ণালি দেখে O, B, A, F, G, K ও M শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন। রায় চৌধুরীর বিবরণে খোলা প্রশ্ন ছিল, বিভিন্ন রঙের নক্ষত্র কি আলাদা আলাদা উপাদানে গড়া। “On a physical theory of stellar spectra” প্রবন্ধে সাহা দেখালেন, একই উপাদান ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় ভিন্ন বর্ণালি দেয়।
এক বায়ুমণ্ডল চাপ ধরে তিনি দেখলেন, প্রায় ১৩,০০০ K তাপমাত্রায় ক্যালসিয়াম পুরোপুরি একবার আয়নিত হয়, অর্থাৎ একটি ইলেকট্রন চলে যায়। সবচেয়ে গরম B নক্ষত্রগুলোতে নিরপেক্ষ রেখা কদাচিৎ দেখা যায়, তাই তিনি ওই নক্ষত্রদের তাপমাত্রা ধরলেন প্রায় ১৩,০০০ K। দ্বিতীয় ইলেকট্রনটি বেরিয়ে যায় প্রায় ২০,০০০ K-তে, আর তাতেই ঠিক হয়ে যায় H ও K রেখা কোথায় মিলিয়ে যাবে। রায় চৌধুরী লিখছেন, বহু রেখা ধরে হিসাব করে সাহা পুরো বর্ণালি-ক্রমকে একটি তাপমাত্রার মাপকাঠিতে বসিয়ে দেন। প্রবন্ধের শেষে তিনি বলেন, তাপমাত্রা ৩০০০ K থেকে ৪০,০০০ K পর্যন্ত বদলালে বর্ণালিতে বিভিন্ন ভৌত প্রক্রিয়া উন্মোচিত হয়।
সাহা বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, আর ১৯২০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে আলফ্রেড ফাউলারের গবেষণাগারে কাজ করেন। চতুর্থ প্রবন্ধটি Philosophical Magazine থেকে তুলে নেওয়া হয়, ফাউলারের সমালোচনা নিয়ে প্রায় চার মাস ধরে নতুন করে লেখা হয়, এবং ১৯২১ সালে Proceedings of the Royal Society-তে ছাপা হয়। রায় চৌধুরী লক্ষ করেছেন, সাহা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধরেছিলেন ৭,৫০০ K, যেখানে প্রকৃত মান ৫,৮০০ K-এর কাছাকাছি।
অন্যরা তত্ত্বটি দ্রুত গ্রহণ করেন। প্রিন্সটনের হেনরি নরিস রাসেল এটিকে গ্যাসের মিশ্রণে প্রসারিত করেন, আর এস রোজল্যান্ড তাঁর ১৯৩৬ সালের পাঠ্যবইয়ে লেখেন: “জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা সাহার কাজ থেকে যে প্রেরণা পেয়েছে, তাকে বাড়িয়ে বলা প্রায় অসম্ভব।”
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটি ভবিষ্যদ্বাণী যাচাই হয়ে যায়। সাহা আশা করেছিলেন সানস্পটের বর্ণালিতে, যেখানে গ্যাস অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা, পটাশিয়াম, রুবিডিয়াম ও সিজিয়ামের রেখা পাওয়া যাবে, আর ১৯২১ সালের ৯ জুলাই তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরের জর্জ এলারি হেলকে অনুরোধ করেন কাউকে দিয়ে দেখিয়ে নিতে। মাউন্ট উইলসনে কর্মরত রাসেল ৩ আগস্ট উত্তর দেন যে “ক্ষারধাতুর রেখা নিয়ে আপনার ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পুরোপুরি যাচাই হয়েছে।” তিনি আরও জানান, রুবিডিয়াম উপস্থিত ছিল।
সিসিলিয়া পেইনের গবেষণাপত্র
হার্ভার্ডে সিসিলিয়া পেইন নামে এক তরুণী ইংরেজ গবেষক সাহার কাজ জানতেন। APS News বলছে, ১৯২৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি তাঁর গবেষণাপত্র Stellar Atmospheres শেষ করেন, যাতে হার্ভার্ডের বর্ণালির ওপর সাহার সমীকরণ প্রয়োগ করা হয়েছিল। Physics World-এর সিডনি পারকোউইটজ বলছেন, তিনি নতুন মাপা শক্তিস্তরের মান সাহার তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে B নক্ষত্রের জন্য প্রায় ২০,০০০ K আর M নক্ষত্রের জন্য ৩,০০০ K তাপমাত্রা পান।
হাইড্রোজেনের ফল ছিল চমকপ্রদ। APS News বলছে, সূর্যের বায়ুমণ্ডলে ৫,৭০০ K তাপমাত্রায় প্রায় ২০ কোটি হাইড্রোজেন পরমাণুর মধ্যে মাত্র একটি সেই অবস্থায় থাকে যা বামার শোষণ-রেখা তৈরি করে, তাই ওই রেখাগুলো আসলে হাইড্রোজেনের পরিমাণকে কম করে দেখায়। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে সূর্য ও নক্ষত্রে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামই প্রধান।
গবেষণাপত্রের বহিরাগত পরীক্ষক রাসেল আপত্তি তোলেন, আর এরপর পেইন কী করলেন সে নিয়ে বিবরণগুলো আলাদা। APS News বলছে, রাসেল তাঁকে সিদ্ধান্তটি বাদ দিতে রাজি করান। পারকোউইটজ বলছেন, চূড়ান্ত পাঠে বিপুল পরিমাণটিকে বলা হয়েছিল “প্রায় নিশ্চিতভাবেই বাস্তব নয়”, আর রাসেল ১৯২৯ সালে অন্য পদ্ধতিতে একই পরিমাণে পৌঁছান।
সমীকরণটি প্রথম কে লিখেছিলেন
সাহা তাঁর প্রথম প্রবন্ধেই আগের একজন লেখকের কথা স্বীকার করেছিলেন। রায় চৌধুরী খুঁজে পেয়েছেন, বার্লিনে ভাল্টার নের্নস্টের অধীনে কর্মরত পদার্থ-রসায়নবিদ জন এগার্ট ১৯১৯ সালের একটি প্রবন্ধে সম্পর্কটি লিখেছিলেন, আর এফ এ লিন্ডেম্যান একই বছর চৌম্বক ঝড় নিয়ে Philosophical Magazine-এর একটি টীকায় তা লিখেছিলেন। এগার্ট শুধু হাইড্রোজেনের জন্যই সংখ্যা বের করতে পারতেন, কারণ অন্য মৌলের শক্তির মান পাওয়ার কোনো উপায় তাঁর ছিল না, আর সাহা সমীকরণের উৎস হিসেবে এগার্টের নাম করেছিলেন।
প্লাসকেটকে লেখা চিঠিতে সাহা জানান, ১৯২১ সালে লন্ডনে লিন্ডেম্যানের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তিনি তাঁর টীকাটির কথা জানতেন না। প্লাসকেট উত্তরে লেখেন, অক্সফোর্ডের পদার্থবিদরা মনে করেন লিন্ডেম্যান যথেষ্ট স্বীকৃতি পাননি, কিন্তু সেই সংশয় তিনি ভাগ করেন না: “এই ধারণা যে কতটা ফলপ্রসূ, তা আপনিই দেখিয়েছিলেন।”
রায় চৌধুরীর সিদ্ধান্ত, সাহাই প্রথম দেখেছিলেন যে পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে সমীকরণটি নক্ষত্রের বর্ণালি ব্যাখ্যা করতে পারে। সমীকরণটির নাম সাহার নামে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, এমন কোনো উক্তি তিনি সাহিত্যে পাননি। ফাউলার প্রসঙ্গে সাহা ১৯৪৬ সালে প্লাসকেটকে লিখেছিলেন যে তিনি ফাউলারের গবেষণাগারে ছিলেন অতিথি ও সহকর্মী, কখনো ছাত্র নন, আর তাঁর প্রথম তিনটি প্রবন্ধ ভারতেই লেখা।
এলাহাবাদ, কলকাতা, আর যে গবেষণাগার তাঁর কখনো হয়নি
পরীক্ষার মাধ্যমে তত্ত্বটি যাচাই করতে সাহা ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্লিনে নের্নস্টের গবেষণাগারে যান। রায় চৌধুরী বলছেন, সেই কাজ থেকে কোনো প্রকাশিত প্রবন্ধ হয়নি, যদিও ১৯২১ সালের আগস্টে সাহা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন যে তিনি দেখিয়েছেন গ্যাস শুধু তাপেই আয়নিত করা যায়। তিনি খয়রা অধ্যাপক হয়ে কলকাতায় ফেরেন, আর বাংলাপিডিয়া অনুসারে ১৯২৩ সালের অক্টোবরে এলাহাবাদে চলে যান, যেখানে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত পড়িয়েছেন। রায় চৌধুরী লিখেছেন, সেখানে তাঁর বানানো চুল্লিটি আজও এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের মাটির নিচের তলায় দাঁড়িয়ে আছে, আর ছাত্রদের সঙ্গে তা থেকে ১৯২৭ সালে একটি ছোট প্রবন্ধ বেরিয়েছিল।
রয়্যাল সোসাইটি ১৯২৭ সালে সাহাকে ফেলো নির্বাচিত করে। রায় চৌধুরী লিখেছেন, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে তিনি ছিলেন নির্বাচিত চতুর্থ ভারতীয়, তাঁর আগে ছিলেন রামানুজন, জগদীশচন্দ্র বসু ও সি ভি রমন। ঐতিহাসিক ডেভিড ডিভর্কিনকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সোসাইটি প্রথমে সাহার যৌবনের বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে সতর্কভাবে খোঁজখবর নিয়েছিল।
রায় চৌধুরী একটি বিবাদের কথাও লিখেছেন। এস এন বসু বলেছিলেন সাহার পরীক্ষামূলক দক্ষতা ভালো ছিল না, যা পালিত অধ্যাপক সি ভি রমন-কে অসন্তুষ্ট করে। ১৯৪৬ সালে প্লাসকেটকে লেখা এক চিঠিতে সাহা অস্বীকার করেন যে তিনি কখনো রমনের ছাত্র ছিলেন: “জীবনে তাঁর কাছে আমার কোনো ঋণ নেই, আছে কেবল অবিরাম বিদ্বেষ আর সুযোগ পেলেই আমার ক্ষতির চেষ্টা।” এটি কেবল সাহার পক্ষের কথা।
সায়েন্স অ্যান্ড কালচার, পরিকল্পনা আর দামোদর
১৯৩৫ সালে সাহা কলকাতায় ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সহকর্মী ডি এম বসু বলছেন, তিনি ১৯৩৫ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তার পত্রিকা Science and Culture ব্যবহার করে জাতীয় উন্নয়নে বিজ্ঞান প্রয়োগের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
১৯৩৮ সালের অক্টোবরে তখনকার কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু প্রদেশগুলোর শিল্পমন্ত্রীদের একটি সভা ডাকেন, যাতে জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হয়। জওহরলাল নেহরু চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন, আর ডি এম বসু বলছেন, সাহা ছিলেন তার সদস্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপকমিটির সভাপতি, এবং নদীপথ পরিবহণ ও সেচ উপকমিটিরও সদস্য। বসু যোগ করেন, স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামের গান্ধীবাদী পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সাহা লড়েছিলেন, যাকে তিনি বলতেন “চরকা আর গরুর গাড়ির মতবাদ”।
১৯৪৩ সালের দামোদরের বন্যা তাঁকে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প দেয়। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের নিজস্ব ইতিহাস-পাতা বলছে, বাংলা সরকার একটি দামোদর বন্যা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে, যার সদস্য ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা ও সাহা। কমিটি প্রস্তাব করে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি ভ্যালি অথরিটির আদলে একটি কর্তৃপক্ষ এবং মোট ১.৫ মিলিয়ন একর-ফুট ধারণক্ষমতার বাঁধ। ওই কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী ডব্লিউ এল ভুরডুইন ১৯৪৪ সালের আগস্টে একটি প্রাথমিক স্মারকলিপি জমা দেন, এবং কর্পোরেশন অস্তিত্ব পায় ১৯৪৮ সালের ৭ জুলাই, স্বাধীন ভারতের প্রথম বহুমুখী নদী-উপত্যকা প্রকল্প হিসেবে।
ডি এম বসু বলছেন, বন্যার পর Science and Culture-এ সাহার ধারাবাহিক লেখায় সেই পরিকল্পনাই প্রস্তাবিত হয়েছিল, আর সাহার পরামর্শেই ভুরডুইনকে আনা হয়। কর্পোরেশনের পাতাটি কেন্দ্রীয় সরকারের দিকটি এগিয়ে নেওয়ার কৃতিত্ব দিচ্ছে তখন স্বাধীনতার আগের মন্ত্রিসভায় থাকা বি আর আম্বেদকরকে। বসু টেনেসি আদর্শকে ভারতের উপযোগী করে নেওয়ার নকশার কৃতিত্ব সাহাকে দিয়েছেন, তবে কয়লাসমৃদ্ধ উপত্যকায় সেচ আর জলবিদ্যুৎ একসঙ্গে জুড়ে দেওয়াকে তিনি ভুল মনে করতেন এবং একটি নিরীক্ষা চেয়েছিলেন।
সংসদে একটি আসন
প্রথম সাধারণ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদনে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম আসনের বিজয়ী হিসেবে রেভোলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির “Meghnath Shah”-এর নাম আছে: ৭৪,১২৪ ভোট (৫৩.০৫ শতাংশ), আর কংগ্রেসের প্রভু দয়াল হিমৎসিংকা পেয়েছিলেন ৫১,১৬৮ (৩৬.৬২ শতাংশ), ভোটদানের হার ৩৬.৫২ শতাংশ। The Statesman-এ লিখতে গিয়ে শ্যামল ভদ্র বলছেন, সাহা জিতেছিলেন নির্দলীয় প্রার্থী হয়ে।
ডি এম বসু সাহার একটি উক্তি তুলে ধরেছেন, ১৯৫২ সালে সংসদে ঢুকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে যৌবনের রাজনৈতিক আন্দোলন বাদ দিলে “১৯৩০ সাল পর্যন্ত আমি হাতির দাঁতের মিনারে বাস করেছি”। বসু বলছেন, সাহা প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ওপর সমালোচনামূলক সম্পাদকীয় লিখেছিলেন, আর পরমাণু শক্তিকে হোমি ভাবার অধীনে রাখার নেহরুর সিদ্ধান্ত তাঁকে নিশ্চয়ই হতাশ করেছিল। বাংলাপিডিয়া অনুসারে সাহা ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে মারা যান, পরিকল্পনা কমিশনের একটি সভায় যোগ দিতে এসে।
নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ইনস্টিটিউট
সাহা পালিত অধ্যাপকের পদ নেন ১৯৩৮ সালে। সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বলছে, ১৯৩৯ সালে অটো হান ও ফ্রিৎস স্ট্রাসম্যানের আবিষ্কৃত বিভাজনে তিনি নিউক্লীয় বিজ্ঞানের সম্ভাবনা দেখতে পান, ১৯৪০ সালের মধ্যে স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রমে নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যা যুক্ত করেন, এবং কিনে না এনে নিজেই একটি ছোট সাইক্লোট্রন বানানোর সিদ্ধান্ত নেন, এই যন্ত্র আধানযুক্ত কণাকে ত্বরান্বিত করে। ডি এম বসু বলছেন, নেহরুর মধ্যস্থতায় দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট থেকে ₹৬০,০০০ এসেছিল।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, আর ইনস্টিটিউট বলছে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। ইরেন জোলিও-কুরি ১৯৫০ সালের ১১ জানুয়ারি ভবনটির উদ্বোধন করেন, সেই তারিখটি এখন প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালিত হয়। ডি এম বসু আর বাংলাপিডিয়া অবশ্য ভিত্তিপ্রস্তরের সাল দিয়েছে ১৯৪৮ আর উদ্বোধনের ১৯৫১। সাহার মৃত্যুর পর ইনস্টিটিউট তাঁর নাম গ্রহণ করে।
সাতটি মনোনয়ন, পুরস্কার একটিও নয়
আর্কাইভে তাঁর মনোনয়ন এভাবে তালিকাভুক্ত: ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় দুটি (দেবেন্দ্র বসু ও শিশির মিত্রের কাছ থেকে), তারপর ১৯৩৭ সালে আর্থার কম্পটন, ১৯৩৯ সালে মিত্র, ১৯৪০ সালে কম্পটন, ১৯৫১ সালে মিত্র আর ১৯৫৫ সালে মিত্র। সাহা নিজে ১৯৫১ সালে আর্নল্ড সমারফেল্ডকে মনোনীত করেছিলেন।
সিং ও রিস, যাঁরা নোবেল কমিটির কাগজপত্র থেকে কাজ করেছেন, ১৯৩০ সালের খুঁটিনাটি দিয়েছেন। মনোনয়নের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ৩৯ জনকে, সাড়া দিয়েছিলেন ৩৭ জন, বৈধ সুপারিশ ছিল ২১টি। রমন পান ১০টি আর সাহা দুটি, দুটিই কলকাতা থেকে, ১৯৩০ সালের ২৫ জানুয়ারির তারিখ দেওয়া একটি যৌথ চিঠিতে। লেখকরা বলছেন, সেই বছর কোনো পশ্চিমা বিজ্ঞানী সাহাকে মনোনীত করেননি, যদিও ১৯২৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নিলস বোরকে লিখেছিলেন যে কম্পটন করার পরিকল্পনা করছেন। আর্কাইভে দেখা যায় কম্পটন তাঁকে মনোনীত করেছিলেন ১৯৩৭ ও ১৯৪০ সালে, ১৯৩০ সালে নয়।
ভূপদার্থবিদ কার্লহাইম-ইয়িলেনশোল্ড সাহার কাজ নিয়ে চার পৃষ্ঠার কিছু বেশি একটি প্রতিবেদন লেখেন। কমিটি কাজটিকে জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছিল, কিন্তু সিং ও রিসের অনুবাদে বলেছিল একে “নতুন কোনো ভৌত আবিষ্কার বলে কমই দেখা যায়”, এটি বরং জানা তথ্যের প্রয়োগ। নির্বাচিত বিকিরণ-চাপ নিয়ে তাঁর কাজকে কমিটি আয়নীকরণ সমীকরণের যুক্তিসঙ্গত পরিণতি বলে গণ্য করেছিল। লেখকরা নিজেদের পাঠও যোগ করেন: রমনের প্রভাবের জন্য দরকার ছিল শুধু একটি পারদ-বাতি আর একটি স্পেকট্রোস্কোপ, আর সাহার কাজের জন্য দরকার ছিল বড় টেলিস্কোপ আর উচ্চ তাপমাত্রার পরীক্ষা, যা চালানোর মতো গবেষণাগার ছিল হাতে গোনা। রায় চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, ১৯৩০ সালে ঘনিষ্ঠভাবে বিবেচিত তিনজন প্রার্থীর একজন ছিলেন সাহা, আর বিংশ শতকের গোড়ায় কোনো জ্যোতিঃপদার্থবিদ নোবেল পাননি, যতদিন না ১৯৬৭ সালে হান্স বেথে তা পেলেন, নোবেল উদ্ধৃতির ভাষায়, “নক্ষত্রে শক্তি উৎপাদন সংক্রান্ত আবিষ্কারের” জন্য।
আর্কাইভে মনোনয়নকারীদের নাম থাকে, কারণ থাকে না, আর এখানে ব্যবহৃত কোনো সূত্রই ১৯৩০ সালের পরে কমিটির যুক্তি জানায় না। সাহার জন্য সর্বশেষ মনোনয়ন এসেছিল ১৯৫৫ সালে শিশির মিত্রের কাছ থেকে।
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
- Arnab Rai Choudhuri (Indian Institute of Science), How the Saha Ionization Equation Was Discovered, arXiv 1810.10898 (Physics News, Indian Physics Association)
- Arnab Rai Choudhuri, The Interaction of Matter and Radiation: The Physics of CV Raman, SN Bose and MN Saha, Part 2, arXiv 2410.00008
- Rajinder Singh and Falk Riess, CV Raman, MN Saha and the Nobel Prize for the Year 1930, Indian Journal of History of Science 34(1), 1999 (based on the Nobel Committee's documents)
- Nobel Prize Nomination Archive: Meghnad N Saha (nominee in 7 nominations, nominator in 1)
- Nobel Prize Nomination Archive: Physics 1930, list of nominees and nominators
- Nobel Prize in Physics 1967: summary (Hans Bethe)
- DM Bose, Meghnad Saha Memorial Lecture, 1965, Proceedings of the National Institute of Sciences of India 33A (1967)
- Saha Institute of Nuclear Physics: Brief History
- Damodar Valley Corporation: Overview (archived copy of the official page)
- Election Commission of India, Statistical Report on the General Elections, 1951, to the First Lok Sabha, Volume 1 (archived copy)
- Banglapedia: Saha, Meghnad
- Richard Williams, January 1, 1925: Cecilia Payne Gaposchkin and the day the universe changed, APS News (American Physical Society), January 2015
- Sidney Perkowitz, Cecilia Payne-Gaposchkin: the woman who found hydrogen in the stars, Physics World (8 March 2022)
- Shyamal Bhadra, Saha in Politics, The Statesman (opinion, 23 May 2024)
এই লেখাটি AI সরঞ্জামের সহায়তায় গবেষণা ও রচনা করা হয়েছে এবং নির্ভুলতার জন্য সম্পাদনা করা হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ তথ্য ও আলোচনার জন্য, পেশাদার পরামর্শ নয়। আমাদের সম্পাদকীয় মান ও দাবিত্যাগ দেখুন। কোনো ভুল চোখে পড়ল? আমাদের জানান।
ভালো লাগল? পরেরটিও পড়ুন।
একবারে একটি ভালো লেখা, সরাসরি আপনার ইনবক্সে। কোনো স্প্যাম নয়, যখন খুশি বন্ধ করতে পারেন।