অলঙ্করণ: tuput
বাংলা
কল্পনা চাওলা ১৯৭৬ সালে কর্নালে স্কুল শেষ করেন, ১৯৮২ সালে চণ্ডীগড়ে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি নেন, আর ১৯৮৮ সালে কলোরাডোতে ডক্টরেট। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে নাসা তাঁকে ২,৯৬২ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে বেছে নেয়, আর ১৯৯৭ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর তিনি এসটিএস-৮৭ অভিযানে কলম্বিয়ায় উড়েছিলেন। ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাঁর দ্বিতীয় উড়ানের শেষে পুনঃপ্রবেশের সময় কলম্বিয়া ভেঙে পড়লে তিনি মারা যান।
১৯৯৭ সালের ১৯ নভেম্বর ইস্টার্ন সময় বিকেল ২টা ৪৬ মিনিটে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ৩৯-বি উৎক্ষেপণ-মঞ্চ থেকে কলম্বিয়া আকাশে উঠল। এসটিএস-৮৭-এর ছজন আরোহীর মধ্যে ছিলেন হরিয়ানার কর্নালে জন্মানো কল্পনা চাওলা, নিজের প্রথম উড়ানে মিশন স্পেশালিস্ট, আর শাটলের রোবট-বাহুর প্রধান চালক।
নাসার অভিযান-নথিতে মোট হিসাব আছে। কলম্বিয়া ১৫ দিন ১৬ ঘণ্টা ৩৪ মিনিটে ২৫২ বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ৬.৫ মিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দেয়, তারপর ৫ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ২০ মিনিটে কেনেডিতে নামে। হ্যান্ডবুক অব টেক্সাস চাওলাকে বলেছে ভারতে জন্মানো প্রথম নারী যিনি মহাকাশে গেছেন, আর লিখেছে প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল কক্ষপথে তাঁকে ফোন করে জানিয়েছিলেন ভারত কতটা গর্বিত।
ছোট শহরের আকাশে পুষ্পক প্রশিক্ষণ-বিমান
এসটিএস-১০৭-এর আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, যা নাসা প্রকাশ করেছিল, চাওলা বলেছিলেন, তিনি ভাগ্যবান যে এমন এক খুব ছোট শহরে বড় হয়েছেন, যা ‘সে সময়ে হাতেগোনা যে কয়েকটি শহরে ফ্লাইং ক্লাব ছিল, তার একটি।’ সেখানে শিক্ষার্থীরা পুষ্পক বিমানে প্রশিক্ষণ নিত, যাকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন ‘পাইপার জে৩ কাবের থেকে খুব একটা আলাদা নয়’ বলে।
চাওলা আর তাঁর ভাই ওপরের দিকে তাকিয়ে সাইকেল চালাতেন, ‘যা করা উচিত নয়,’ দেখার চেষ্টা করতেন বিমানগুলো কোন দিকে যাচ্ছে। একবার তাঁদের বাবা তাঁদের ফ্লাইং ক্লাবে নিয়ে গিয়ে একটা পুষ্পকে আর একটা গ্লাইডারে চড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
জে. আর. ডি. টাটা, যিনি ভারতের প্রথম কয়েকটি ডাক-উড়ান চালিয়েছিলেন, ছিলেন আরেকটি প্রভাব, আর তিনি যে বিমান চালাতেন সেটা কল্পনা দেখেছিলেন, যা ভারতের একটি বিমানবন্দরে ঝোলানো আছে। ‘এই বিমানটা দেখে আর ওই বছরগুলোতে এই মানুষটা কী করেছিলেন সেটা জেনে ভীষণ কৌতূহল জেগেছিল। নিশ্চিতভাবে আমার কল্পনাকে আচ্ছন্ন করেছিল,’ তিনি বলেছিলেন।
ভারতে শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণির কাছাকাছি, বয়স প্রায় ১২, একটা শাখা বেছে নেয়, তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন। এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলেন বলে তিনি বেছেছিলেন পদার্থবিদ্যা, রসায়ন আর গণিত। নাসার জীবনীতে লেখা আছে, তিনি ১৯৭৬ সালে কর্নালের টেগোর স্কুল থেকে পাস করেন।
নথিতে তাঁর জন্মতারিখ দুভাবে পাওয়া যায়। তাঁর নির্বাচনের বিষয়ে নাসার ১৯৯৪ সালের ঘোষণা আর এসটিএস-১০৭ স্মৃতিপাতা দেয় ১৯৬১ সালের ১ জুলাই, আর গেলের রেফারেন্স জীবনীও একমত। হ্যান্ডবুক অব টেক্সাস দেয় ১৯৬২ সালের ১৭ মার্চ, আর টেগোর বাল নিকেতন, তাঁর স্কুল, শুধু বলে তিনি ১৯৬২ সালে জন্মেছিলেন।
চণ্ডীগড়, ১৯৮২
চাওলা ১৯৮২ সালে চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ‘পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পাওয়াটা আমার ভাগ্য ছিল,’ তিনি নাসার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। তখনকার লক্ষ্য ছিল বিমানের নকশা। ওই পর্যায়ে মহাকাশচারী হওয়ার আভাসমাত্র ছিল বলে দাবি করা, তিনি বলেছিলেন, হত ‘সত্যিই, সত্যিই অবাস্তব।’
প্রথম বর্ষের ছাত্রী হিসেবে তিনি লোকজনকে বলতেন তিনি ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হতে চান, এমন একটা কাজ যা তিনি স্বীকার করেছিলেন তখনও বুঝতেন না। এসটিএস-১০৭-এ তিনি ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেই উড়েছিলেন। হ্যান্ডবুক অব টেক্সাস অনুযায়ী, কলেজটিতে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়া তিনিই প্রথম নারী।
সেই বছরগুলোর এক রুমমেট, ডক্টর বরিন্দর কৌর, ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘মন্টু’, চাওলার ডাকনাম, ছিলেন ‘দৃঢ়সংকল্প আর একরোখা’, আর এমন এক সেরা ছাত্রী যিনি ‘কখনও বইয়ের পোকা ছিলেন না।’ কৌর বলেছিলেন, বিদেশে পড়ার জন্য জিআরই পরীক্ষায় চাওলা উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁর মা অনুমতি বা টাকা কোনোটাই দিতে নারাজ ছিলেন। চাওলা কলেজে শিক্ষণ-সহকারীর চাকরি নেন, যুক্তি ছিল, দু-এক বছর বাড়ি থেকে দূরে থাকলে হয়তো মা রাজি হবেন।
গেলের একটি জীবনী শেষ মুহূর্তের অংশটা যোগ করে। আর্লিংটনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের শেষ তারিখ ঘনিয়ে আসার সময় তাঁর বাবা ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলেন। ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে মেয়ে কী করতে চায় তা শুনে তিনি ২৬ আগস্ট তাঁর ক্লাসঘরে গিয়ে সম্মতি দেন। শেষ তারিখ ছিল ৩১ আগস্ট।
পরিবারের অনুভূতি কেমন ছিল, সে নিয়ে বিবরণগুলোর সুর আলাদা। পারিবারিক সূত্রে তাঁর বোন নীরজা নাগপাল ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, চাওলা বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বেছে নিতে ‘সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়েছিলেন’, আর তাঁর সাফল্যের পরেই বাবার গর্ব এসেছিল।
আর্লিংটন, বোল্ডার আর হ্যারিয়ার
নাসার জীবনী অনুযায়ী এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এসেছিল ১৯৮৪ সালে আর্লিংটনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আর একই বিষয়ে ডক্টরেট ১৯৮৮ সালে কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গেলের মতে আর্লিংটনে তাঁর পরিচয় হয় উড়ান-প্রশিক্ষক জাঁ-পিয়ের হ্যারিসনের সঙ্গে। তাঁরা পরে বিয়ে করেন।
১৯৮৮ থেকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার এমস রিসার্চ সেন্টারে কাজ করেন, পাওয়ার্ড-লিফট কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডায়নামিক্সে। সেখানে তাঁর কাজ ছিল ‘গ্রাউন্ড-এফেক্ট’-এ হ্যারিয়ারের মতো বিমানের চারপাশে বাতাসের জটিল প্রবাহের সিমুলেশন। ১৯৯৩ সাল নাগাদ তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার লস অল্টোসের ওভারসেট মেথডসে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও গবেষণা-বিজ্ঞানী, ‘চলমান বহু-বস্তুর সমস্যা’ নিয়ে একটি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
তিনি নিজেও উড়তেন। নাসার তালিকা অনুযায়ী লাইসেন্সগুলো ছিল বিমান ও গ্লাইডারের রেটিং সহ সার্টিফায়েড ফ্লাইট ইন্সট্রাক্টরের, একক ও বহু-ইঞ্জিনের স্থলবিমান, জলবিমান আর গ্লাইডারের বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স, এবং ইনস্ট্রুমেন্ট রেটিং। অ্যাক্রোব্যাটিক উড়ান আর টেইল-হুইল বিমান ছিল তাঁর প্রিয়। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে তিনি মার্কিন নাগরিক হন আর মহাকাশচারী হতে ভারতীয় নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন, হ্যান্ডবুক অব টেক্সাস লিখেছে।
২,৯৬২ জনের মধ্য থেকে উনিশজন
১৯৯৪ সালের ৮ ডিসেম্বর নাসা ১৯ জন নতুন মহাকাশচারী-প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে, ২,৯৬২ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে বাছা। আবেদনকারীদের মধ্যে ১২২ জনকে নাসা সাক্ষাৎকার আর চিকিৎসা-মূল্যায়নের জন্য হিউস্টনে এনেছিল। এই দলে নয়জন মিশন স্পেশালিস্টের একজন ছিলেন চাওলা, আর বিজ্ঞপ্তিতে তাঁকে লেখা হয়েছে অসামরিক ব্যক্তি, গবেষণা-বিজ্ঞানী আর ওভারসেট মেথডসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে।
১৯৯৫ সালের মার্চে তিনি জনসন স্পেস সেন্টারে যোগ দেন। এক বছরের প্রশিক্ষণের পর চাওলা মহাকাশচারী দপ্তরের ইভিএ/রোবোটিক্স এবং কম্পিউটার শাখার ক্রু প্রতিনিধি হন, রোবোটিক সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস ডিসপ্লে নিয়ে কাজ করেন, আর শাটল অ্যাভিওনিক্স ইন্টিগ্রেশন ল্যাবরেটরিতে শাটলের নিয়ন্ত্রণ-সফটওয়্যার পরীক্ষা করেন। ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে নাসা তাঁকে এসটিএস-৮৭-এ মিশন স্পেশালিস্ট ও প্রধান রোবট-বাহু চালক হিসেবে নিয়োগ করে।
২৫২ পরিক্রমা
এসটিএস-৮৭ ছিল চতুর্থ মার্কিন মাইক্রোগ্র্যাভিটি পেলোড উড়ান। এর পরীক্ষাগুলো ভারশূন্যতায় উপাদানবিজ্ঞান, দহনবিজ্ঞান আর মৌলিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে অধ্যয়ন করেছিল, আর নাসার আর্কাইভ কাজটিকে লিখেছে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে। দ্বিতীয় প্রধান পেলোড স্পার্টান ২০১-০৪ ছিল একটি মুক্তভাবে উড়ন্ত মহাকাশ-পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল করোনা অধ্যয়নের জন্য।
চাওলা উড়েছিলেন কমান্ডার কেভিন ক্রেগেল, পাইলট স্টিভেন লিন্ডসে, মিশন স্পেশালিস্ট উইনস্টন স্কট আর জাপানের তাকাও দোই, এবং ইউক্রেনীয় পেলোড স্পেশালিস্ট লিওনিদ কাদেনিউকের সঙ্গে। দোই মহাকাশে হাঁটা প্রথম জাপানি নাগরিক হন।
গেলের জীবনীতে উদ্ধৃত আছে ওপর থেকে ভারতকে দেখা নিয়ে তিনি নিউজ ইন্ডিয়া-টাইমসকে কী বলেছিলেন: ‘গঙ্গা উপত্যকা দেখাচ্ছিল রাজকীয়, মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো।’ গেল জানিয়েছে, অন্য সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি সহযাত্রীদের নয়াদিল্লি দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ওর কাছেই থাকতাম।’ ভারতের পত্রিকা দ্য উইক শাটলের ভেতরে ভাসমান অবস্থায় তাঁকে প্রচ্ছদে ছেপেছিল।
টেগোর বাল নিকেতন বলছে, তিনি স্কুলের একটি টি-শার্ট সঙ্গে নিয়েছিলেন, যাতে ছিল তাঁর ছবি, স্কুলের প্রতীক আর লেখা ‘কল্পনার জন্য গর্বিত টেগোরিয়ানরা।’ নাসা তাঁর অনুরোধে স্কুলটিকে হিউস্টনে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্কুল ফাউন্ডেশন পরিচালিত তার সামার স্পেস এক্সপেরিয়েন্স প্রোগ্রামেও আমন্ত্রণ জানায়। ১৯৯৮ সালে প্রথম দুই শিক্ষার্থী হিসেবে গিয়েছিল কমলিকা আর সঞ্চারী বোস, আর কর্মসূচিতে ছিল তাঁর বাড়িতে নৈশভোজ, যেখানে ভারতীয় খাবার তিনি নিজে রান্না করেছিলেন।
যে উপগ্রহ ঘুরল না
স্পার্টানকে ছাড়ার কথা ছিল ২০ নভেম্বর, আর নাসা ছাড়া একদিন পিছিয়ে দিয়েছিল যাতে আগে থেকেই কক্ষপথে থাকা সৌর মহাকাশযান সোহো আবার চালু হতে পারে। ২১ নভেম্বর ইস্টার্ন সময় বিকেল ৪টা ০৪ মিনিটে চাওলা বাহু দিয়ে স্পার্টানকে ছেড়ে দেন। কয়েক মিনিট পরে সেটি তার পরিকল্পিত পিরুয়েট কৌশল সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হল। চাওলা সেটিকে আবার ধরেন, কিন্তু ধরা পড়ার কোনো নিশ্চিত সংকেত পাননি, আর উপগ্রহটিতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দুই ডিগ্রির একটি ঘূর্ণন তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
২৪ নভেম্বর স্কট আর দোই সাত ঘণ্টা ৪৩ মিনিট মহাকাশে হেঁটে ইস্টার্ন সময় সন্ধ্যা ৯টা ০৯ মিনিটে হাত দিয়ে স্পার্টানকে ধরে ফেলেন। অভিযানের প্রতিবেদন বলছে, কোনো সৌর-বিজ্ঞানের তথ্য ফেরত না দিয়েই স্পার্টান বাহুর সাহায্যে মালবাহী কক্ষে ফিরে গেল।
অভিযান-প্রতিবেদনের ভাষায়, ‘সব ইঙ্গিতই বলছে ছাড়ার আগে মহাকাশযানটিকে ঠিকমতো প্রারম্ভিক অবস্থায় আনা হয়নি,’ আর একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত বোর্ড গঠিত হয়। সেই বিবরণে কোনো ব্যক্তির নাম নেই। পাঁচ মাসের নাসা-তদন্ত, অ্যাস্ট্রোনটস মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের ভাষায়, ‘সফটওয়্যার ইন্টারফেসের ভুল এবং উড়ান-দল ও ভূমি-নিয়ন্ত্রণের নির্ধারিত পদ্ধতির ভুল চিহ্নিত করে চাওলাকে দায়মুক্ত করেছিল।‘
বিজ্ঞান-অভিযানে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার
দুর্ঘটনা বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি এসটিএস-১০৭-এর সাতজন সদস্যের মধ্যে সবার শেষে চাওলা কলম্বিয়ায় ঢোকেন, ইস্টার্ন সময় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে। হ্যাচ বন্ধ হয় ৯টা ১৭ মিনিটে, আর দু বছরে ১৩ বার পিছিয়ে যাওয়ার পর কলম্বিয়া আকাশে ওঠে ১০টা ৩৯ মিনিটে।
ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ও মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে চাওলা ছিলেন রেড টিমে, কমান্ডার রিক হাজব্যান্ড, লরেল ক্লার্ক আর ইলান রামনের সঙ্গে। দুটি শিফটে সাতজন চব্বিশ ঘণ্টা কাজ চালিয়ে যেতেন। তাঁর পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ছিল অ্যাস্ট্রোকালচার, অ্যাডভান্সড প্রোটিন ক্রিস্টাল ফ্যাসিলিটি, মেকানিক্স অব গ্র্যানুলার মেটেরিয়ালস আর জিওলাইট ক্রিস্টাল গ্রোথ ফার্নেস। উড়ানের আগে তিনি বর্ণনা করেছিলেন কোষ-কলার একটি বায়োরিঅ্যাক্টর দেখাশোনার কথা, যা বাড়ানো হচ্ছিল ‘প্রস্টেট ক্যানসার আরও ভালো করে বোঝার জন্য।’ নাসার জীবনী বলছে, প্রায় ৮০টি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।
প্রতিবেদন বলছে, অভিযানের প্রশিক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ৪,৮১১ ঘণ্টায়, তার ওপর পেলোডের জন্য আরও ৩,৫০০। নাসার স্মৃতিপাতায় তালিকাভুক্ত, কক্ষপথে ঘুম ভাঙানোর যেসব গান বাজানো হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল উড়ানের তৃতীয় দিনে ডিপ পার্পলের ‘স্পেস ট্রাকিন’ আর সপ্তম দিনে রবি শঙ্করের ‘প্রভাতী’। ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্মরণসভায় মহাকাশচারী দপ্তরের প্রধান কেন্ট রোমিঙ্গার বলেছিলেন, প্রশিক্ষণ লম্বা হয়ে গেলে তিনি সহকর্মীদের মনে করিয়ে দিতেন, ‘আরে, তোমরা মহাকাশে ওড়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছ। আর কী চাও?’
প্রতিবেদনে লেখা আছে, হাজব্যান্ড, পাইলট উইলিয়াম ম্যাকুল আর চাওলা ৩০ জানুয়ারি প্রশিক্ষণ-কম্পিউটারে অবতরণের সিমুলেশন চালান, তারপর ৩১ জানুয়ারি দ্বিতীয়বার।
অবতরণ থেকে ষোলো মিনিট দূরে
দুর্ঘটনা বোর্ডের বিবরণে, উৎক্ষেপণের পরে তোলা আলোকচিত্রে দেখা যায়, উড়ানের ৮১.৭ সেকেন্ডে বাইরের জ্বালানি-ট্যাংকের বাঁ বাইপড র্যাম্প থেকে অন্তরক ফোমের একটি বড় টুকরো আর অন্তত দুটি ছোট টুকরো আলাদা হয়ে যায়। ৮১.৯ সেকেন্ডে বড় টুকরোটি কলম্বিয়ার বাঁ ডানার নিচের দিকে আঘাত করে, রিইনফোর্সড কার্বন-কার্বন প্যানেল ৫ থেকে ৯ নম্বরের কাছে।
১ ফেব্রুয়ারি ইস্টার্ন সময় সকাল ৮:১৫:৩০-এ কক্ষপথ-ত্যাগের ইঞ্জিন-জ্বালন শুরু হয়, আর কলম্বিয়া বায়ুমণ্ডলে পৌঁছায় ৮:৪৪:০৯-এ। ৮:৫৯:৩২-এ কমান্ডারের শেষ বার্তা ছিল ভাঙা ভাঙা একটি ‘রজার।’ ৯:০০:১৮-এ মাটিতে থাকা দর্শকদের তোলা ভিডিওতে দেখা যায় অরবিটারটি ভেঙে পড়ছে। অবতরণের সময় ঠিক ছিল ৯:১৬।
প্রতিবেদনে বস্তুগত কারণ নিয়ে সিদ্ধান্ত এভাবে লেখা: ‘কলম্বিয়া ও তার ক্রুদের হারানোর বস্তুগত কারণ ছিল বাঁ ডানার সামনের ধারে তাপ-সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি ভাঙন।’ এও পাওয়া গিয়েছিল যে ‘কলম্বিয়া আর চ্যালেঞ্জার দুটোই হারিয়ে গিয়েছিল নাসার সাংগঠনিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণেও।’ সাতজন সদস্যই মারা যান, ইসরায়েলের প্রথম মহাকাশচারী রামনও।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, আর যা তাঁর নাম বহন করে
২ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে তাঁর ভাই সঞ্জয় চাওলা পিটিআইকে বলেছিলেন, তিনি ‘ঝুঁকির পরোয়া করতেন না আর নিজের কাজ নিয়ে ছিলেন গভীর অনুরাগী।’ এক আত্মীয় অনিল নাগপাল বলেছিলেন, পরিবার অভিযানটি নিয়ে ‘খুবই শঙ্কিত’ ছিল আর আবেগঘন বিদায় জানিয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালাম হরিয়ানার রাজ্যপালকে আলাদা একটি বার্তা পাঠান। তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের কল্পনা চাওলা মহাকাশ-অভিযানের অংশ ছিলেন বলে ভারত বিশেষভাবে গর্বিত ছিল।’ নাসার স্মৃতিপাতা রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ. বুশকে উদ্ধৃত করেছে: ‘তিনি ছাত্রী হিসেবে ভারত ছেড়েছিলেন, কিন্তু নিজের জন্মের দেশকে, তার সবটাই, দেখবেন শত শত মাইল ওপর থেকে।’
নাসার জীবনী অনুযায়ী মৃত্যুর পর তাঁকে কংগ্রেশনাল স্পেস মেডেল অব অনার, নাসা স্পেস ফ্লাইট মেডেল আর নাসা ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস মেডেল দেওয়া হয়।
ইসরোর মোসড্যাক আর্কাইভ অনুযায়ী ২০০৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ইসরোর আবহাওয়া উপগ্রহ মেটস্যাটের নাম বদলে রাখেন কল্পনা-১। ২০০২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পিএসএলভি রকেটে এটি উৎক্ষেপিত হয়েছিল, যে রকেটের কথা আছে ইসরো নিয়ে আমাদের লেখায়, আর এটিই ছিল প্রথম উপগ্রহ যা পিএসএলভি ভূস্থির কক্ষপথে বসায়। ১৯৭৫ সালে উৎক্ষেপিত ভারতের প্রথম উপগ্রহ বহন করেছিল পঞ্চম শতকের গণিতবিদ আর্যভট্টের নাম, নাসার হেসার্ক রেকর্ড করেছে।
চণ্ডীগড় প্রশাসন পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সেরা অ্যারোনটিক্যাল শিক্ষার্থীর জন্য কল্পনা চাওলা স্মৃতি পুরস্কার চালু করে, ২৫,০০০ টাকা, একটি পদক আর একটি সনদ সহ। পিইসি-র এক সহপাঠী অনুপ চৌহান ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, তিনি অল্প টাকার পরিবারের দুজন ছাত্রীর ফি দিয়েছিলেন, আর দুজনেই পরে ডক্টরেট করেছেন।
কর্নালে হরিয়ানা সরকার তাঁর নামে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন করেছে, যা নিজের বিবরণে বলে ৫৩৬টিরও বেশি শয্যা আর ১০০টি এমবিবিএস আসন আছে। টেগোর বাল নিকেতন তাদের প্রেক্ষাগৃহের নাম রেখেছে তাঁর নামে। জ্যোতিসারের একটি তারামণ্ডল হ্যান্ডবুক অব টেক্সাসের তালিকায় আছে, যে তালিকা এও লিখেছে যে ২০০৪ সালে মঙ্গল-বিজ্ঞানীরা স্পিরিট রোভার অভিযানের জন্য সাতটি পাহাড়ের নাম রেখেছিলেন কলম্বিয়ার সাত সদস্যের নামে।
স্কুলের পাতায় তাঁর ভাই সঞ্জয়ের উদ্ধৃতি আছে: ‘আমার কাছে আমার বোন মারা যায়নি। সে অমর।’ পাতাটিতে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বিমলা রাহেজার কাছে তাঁর ২০০২ সালের ১৬ জানুয়ারির ই-মেলও ছাপা আছে: ‘আমার পরের উড়ানে, যা এখন ২৫ জুন উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত, আমি টেগোর স্কুলের জন্য একটা জিনিস নিয়ে উড়তে খুবই ইচ্ছুক।’ ২০০২ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি লিখেছিলেন: ‘কলম্বিয়ায় ওড়ানোর জন্য আপনার বানানো একেবারে সুন্দর ব্যানারটি আমি পেয়েছি।’
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
- NASA, Biographical Data: Kalpana Chawla (Ph.D.), NASA Astronaut (Deceased), May 2004
- NASA, 1995 Astronaut Candidates Selected (Release 94-205, 8 December 1994), archived copy
- NASA, STS-87 mission archive
- NASA, STS-87 Space Shuttle Mission Report (NSTS-37418, February 1998)
- NASA, STS-107 Memorial: Kalpana Chawla (archived 2004 copy)
- NASA, STS-107 Crew Interviews: Kalpana Chawla, preflight interview, December 2002 (archived copy)
- Columbia Accident Investigation Board, Report Volume I, Chapter 2: Columbia's Final Flight
- Columbia Accident Investigation Board, Report Volume I, Chapter 3: Accident Analysis
- Columbia Accident Investigation Board, Report Volume I, Chapter 8: History as Cause
- ISRO Space Applications Centre, MOSDAC: Kalpana-1 introduction
- NASA HEASARC: The Aryabhata satellite
- The Tribune (Chandigarh), 3 February 2003, Nation page: Kalpana was unfazed by risks; Kalam condoles Kalpana's death
- The Tribune (Chandigarh), 3 February 2003, Chandigarh page: Kalpana leaves a legacy of love, courage; Kalpana Chawla Award instituted
- Tagore Baal Niketan Senior Secondary School, Karnal: Kalpana Chawla Story
- Kalpana Chawla Government Medical College and Hospital, Karnal: About KCGMC
- Texas State Historical Association, Handbook of Texas: Chawla, Kalpana
- Encyclopedia.com (Gale), Chawla, Kalpana, U.S. Immigration and Migration Reference Library
- Astronauts Memorial Foundation: Kalpana Chawla
পর্দায় ও বইয়ে
- Dreams That Touched the Sky (2019) , English . তাঁর জীবন নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র, ২০১৯ সালের অক্টোবরে জিও মামি মুম্বই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত, সংবাদ সংস্থা আইএএনএস-কে তাঁর সম্পর্কে কথা বলেছেন তাঁর বাবা
- The Edge of Time (2011) , লেখক Jean-Pierre Harrison , English . তাঁর স্বামীর লেখা একটি জীবনী
এই তালিকা তাঁদের জন্য যাঁরা পর্দায় দেখা গল্পের পিছনের ইতিহাস খুঁজছেন। কোনো নাট্যরূপ সূত্র নয়, এবং এই কাজগুলির কোনোটির সঙ্গে tuput যুক্ত নয়।
এই লেখাটি AI সরঞ্জামের সহায়তায় গবেষণা ও রচনা করা হয়েছে এবং নির্ভুলতার জন্য সম্পাদনা করা হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ তথ্য ও আলোচনার জন্য, পেশাদার পরামর্শ নয়। আমাদের সম্পাদকীয় মান ও দাবিত্যাগ দেখুন। কোনো ভুল চোখে পড়ল? আমাদের জানান।
ভালো লাগল? পরেরটিও পড়ুন।
একবারে একটি ভালো লেখা, সরাসরি আপনার ইনবক্সে। কোনো স্প্যাম নয়, যখন খুশি বন্ধ করতে পারেন।