অলঙ্করণ: tuput
বাংলা
স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই দিল্লিতে পৌঁছে দেখলেন দুই সীমানা কমিশনেরই বিচারকরা দুই ভাগ হয়ে গেছেন, আর তিনি পাঞ্জাব ও বাংলার রায়ে তারিখ দিলেন ১২ আগস্ট, সিলেটের রায়ে ১৩ আগস্ট। লর্ড মাউন্টব্যাটেন লিখেছেন, তিনি ইচ্ছে করেই বাংলার রায়টা পড়েননি, ১৬ আগস্ট মন্ত্রীদের হাতে পাঠ তুলে দিলেন আর ১৭ আগস্ট তা প্রকাশ করালেন।
১৯৪৭ সালের ১৬ আগস্ট বিকেল পাঁচটায় লর্ড মাউন্টব্যাটেন নয়াদিল্লির গভর্নমেন্ট হাউসের কাউন্সিল চেম্বারে সভাপতির আসন নিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল, লিয়াকত আলি খান আর আরও তিনজন মন্ত্রী। সীমানা-রায়ের কপি, তার দুটোর তারিখ ১২ আগস্ট, মন্ত্রীদের কাছে পৌঁছেছিল সেদিন সকালে। কার্যবিবরণীতে বাংলার রায় নিয়ে নেহরুর কথা লেখা আছে: পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব বাংলায় চলে গেছে, আর ‘স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের সেগুলোতে হাত দেওয়ার কোনো অধিকার ছিল না।’
র্যাডক্লিফ ঘরে ছিলেন না। স্বাধীনতার আগের দিন তিনি তাঁর সৎছেলেকে লিখেছিলেন ভাইসরয়ের নিজের চিঠির কাগজে। ‘আগামীকাল সন্ধ্যার পর,’ তিনি বললেন, ‘আর কাউকে কখনো এই কাগজ ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, আর ১৫০ বছর পর ভারতে ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়ে যাবে।’ পাকিস্তানের দ্য নিউজ অন সানডে চিঠিটা ছেপেছিল, যা এসেছে মেরিনা হুইলারের পারিবারিক ইতিহাস The Lost Homestead থেকে। কয়েক লাইন পরে তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রায় ৮০ মিলিয়ন মানুষের ক্ষোভ থাকবে, যারা আমাকে খুঁজতে শুরু করবে।’
এ গল্পের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো পাঁচ সপ্তাহে আঁকা র্যাডক্লিফ রেখা, যা রূপরেখা দেয়। এই লেখা রায়গুলো পড়ে সে সময়ের কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে, বিশেষ করে ব্রিটিশ সরকারের সিরিজ The Transfer of Power-এর দ্বাদশ খণ্ড, যাতে তিনটে রায় আর সপ্তাহটার ব্যাপারে মাউন্টব্যাটেনের নিজের বিবরণ ছাপা আছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগকে ভাবনাযোগ্য করে তোলা ঔপনিবেশিক যন্ত্রের কথা পাবেন পরিকল্পিত সেই বিভাজনের লেখায়। বাংলার আগের কাটাছেঁড়ার জন্য দেখুন লর্ড কার্জন ও বঙ্গভঙ্গ।
ফেব্রুয়ারিতে ঠিক হওয়া, জুনে এগিয়ে আনা এক তারিখ
১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকার পার্লামেন্টকে জানাল ‘দায়িত্বশীল ভারতীয় হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার, ১৯৪৮ সালের জুনের পরে নয় এমন এক তারিখের মধ্যে, নিশ্চিত অভিপ্রায়।’ সেদিনের ঘোষণাগুলোতে মাউন্টব্যাটেনকে পরবর্তী ভাইসরয় বলে নাম করা হয়েছিল। চার্চিলের অনুপস্থিতিতে ১০ জুলাই রক্ষণশীলদের পক্ষে বলতে গিয়ে হ্যারল্ড ম্যাকমিলান বললেন, নির্দিষ্ট তারিখটা ‘আমাদের কাছে কর্তব্য ত্যাগ বলে মনে হয়েছিল।’ তিনি যোগ করলেন, ‘পাঞ্জাব ভাগ আমাদের আশঙ্কায় ভরে দেয়, আর বাংলা ভাগ এক অতি সূক্ষ্ম আর বিপজ্জনক উদ্যোগ।’
সময়সীমার দশ মাস আগেই ক্ষমতা হাতবদল হলো। সিরিজের সম্পাদকরা কৃতিত্ব দেন ভাইসরয়ের সময়সূচির বোধ আর বাড়তে থাকা ভারতীয় চাপকে, ‘বিশেষ করে কংগ্রেসের’, যার ফলে ‘হস্তান্তর ঘটল ১৯৪৭ সালের আগস্টে।’ ১০ মে, তাঁরা লিখেছেন, নেহরু মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন ‘ডোমিনিয়ন মর্যাদার ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া’ খুবই কাম্য।
৩ জুনের পরিকল্পনা ঘোষণার পরদিন মাউন্টব্যাটেনের প্রেস অ্যাটাশে অ্যালান ক্যাম্পবেল-জনসন লিখে রাখলেন, এক সংবাদ সম্মেলনে ভাইসরয় ‘প্রথম অনানুষ্ঠানিক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ১৫ আগস্ট সম্ভাব্য তারিখ হবে।’ ১ আগস্ট মাউন্টব্যাটেন লিখলেন, তিনি ‘আগের চেয়ে আরও নিশ্চিত যে হস্তান্তরের তারিখ ১ অক্টোবর হলে সেই তারিখের আগে পুরো ভেঙে পড়ার গুরুতর ঝুঁকি থাকত।’ ক্যাম্পবেল-জনসন ভি-জে ডে-র দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে একটা বেতার ভাষণ লিখেছিলেন, যা, তিনি বলেছিলেন, ‘১৫ আগস্টের দ্বিগুণ অর্থ মনে গেঁথে দেবে।’
দুই কমিশনকেই এই তারিখে কাজ শেষ করতে হত। ৮ জুলাই, র্যাডক্লিফের পৌঁছোনোর দিন, মাউন্টব্যাটেন কর্মীদের বললেন তিনি চান কাজ ১৪ আগস্টের মধ্যে শেষ হোক। তিন দিন পরে তিনি জানালেন, ‘নেহরু, জিন্নাহ আর সীমানা কমিশনগুলো সবাই রাজি হয়েছে যে কাজ ১৫ আগস্টের মধ্যে শেষ করতে হবে, আর স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ তাতে সম্মত।‘
আটজন বিচারক আর সিদ্ধান্ত নিতে হওয়া এক সভাপতি
শর্তগুলো এসেছিল ভারতীয় নেতাদের কাছ থেকে। মাউন্টব্যাটেনের শেষ ব্যক্তিগত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যার তারিখ ১৬ আগস্ট, নেহরু প্রস্তাবিত শর্ত পাঠিয়েছিলেন ১২ জুন আর জিন্নাহ তা মেনে নিয়েছিলেন ২৩ জুন। প্রতিটা কমিশনকে বলা হয়েছিল তার প্রদেশের ‘দুই অংশের সীমানা চিহ্নিত করতে, মুসলমান আর অমুসলমানদের সংলগ্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নির্ধারণের ভিত্তিতে,’ আর ‘অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করতে।’ ‘অন্যান্য বিষয়’ কী, কেউ তা ঠিক করে দেয়নি। ১০ জুলাই দেশভাগ পরিষদ একমত হলো যে আর কোনো নির্দেশ দেওয়া হবে না আর কমিশনগুলো কথাগুলোর ব্যাখ্যা নিজেরাই করবে।
২৭ জুন দুই দলের নেতারা একমত হলেন যে র্যাডক্লিফ দুই কমিশনেরই সভাপতি হবেন। ক্যাম্পবেল-জনসন প্রস্তাবটার কৃতিত্ব দেন জিন্নাহকে। প্রতিটা কমিশনে চারজন বিচারক ছিলেন, দুজনকে নাম করেছিল কংগ্রেস আর দুজনকে মুসলিম লিগ। পাঞ্জাবে তাঁরা ছিলেন মেহের চাঁদ মহাজন, তেজা সিং, দীন মুহাম্মদ আর মুহাম্মদ মুনির। বাংলায় ছিলেন সি. সি. বিশ্বাস, বি. কে. মুখার্জি, আবু সালেহ মোহাম্মদ আকরাম আর এস. এ. রহমান।
র্যাডক্লিফ লিখেছেন, তিনি কলকাতায় ১৬ থেকে ২৪ জুলাই আর লাহোরে ২১ থেকে ৩১ জুলাই চলা প্রকাশ্য বৈঠকগুলোর কোনোটাতেই যাননি। তার বদলে তিনি প্রতিদিনের নথি পড়তেন। সিমলায়, তাঁর প্রতিবেদন বলছে, ‘আমার সহকর্মীদের মতভেদ এত বিশাল ছিল যে সীমানা-সমস্যার একটা সর্বসম্মত সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়নি।’ বিচারকরা মতভেদ করেছিলেন ‘অন্যান্য বিষয়’ নিয়ে আর ‘সেই বিষয়গুলোর উপর আরোপযোগ্য গুরুত্ব আর মূল্য’ নিয়ে। তাঁরা ‘এই সিদ্ধান্তে সম্মত হলেন যে আমাকেই আমার নিজের সিদ্ধান্ত দিতে এগোতে হবে।’ বাংলায় তাঁর সহকর্মীরা ‘এই বড় বিষয়গুলোর কোনোটিতেই একমত হতে পারেননি।‘
র্যাডক্লিফ যা বিবেচনা করছিলেন বলে লিখেছেন
র্যাডক্লিফ বিতর্কিত এলাকাটাকে রেখেছিলেন বিয়াস আর সুতলজ নদীর মাঝখানে এক পাশে আর রাভির অন্য পাশে। সেখানকার খালগুলো ছিল ‘পাঞ্জাবের জীবনের পক্ষে এতই অপরিহার্য, কিন্তু গড়ে উঠেছিল কেবল একটা মাত্র প্রশাসনের ধারণায়।’ এ ছাড়া ছিল ‘লাহোর আর অমৃতসরের নিজ নিজ অবস্থানের একগুঁয়ে ভৌগোলিক বাস্তবতা।’
সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়মকে ডিঙিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তিনি লিখিতভাবে রেখে গেছেন। সুতলজের পূর্বে, আর বিয়াস আর সুতলজের কোণে, ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘নগণ্য নয় এমন এলাকা।’ তিনি ঠিক করলেন পশ্চিম পাঞ্জাবকে ‘সুতলজের ওপারে একটা ফালি’ দেওয়া ‘কোনো রাষ্ট্রেরই প্রকৃত স্বার্থে হবে না।’ রেল আর জলব্যবস্থা ‘এ ক্ষেত্রে সংলগ্ন সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রাথমিক দাবিকে সরিয়ে দেওয়াই উচিত।’ তিনি আপার বারি দোয়াব খালকে অখণ্ড রাখতে পারেননি, আর আশা করেছিলেন দুই রাষ্ট্র খাল, রেল আর মান্ডি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘কিছু যৌথ নিয়ন্ত্রণ’ মেনে নেবে। পরস্পরবিরোধী আকাঙ্ক্ষা, তিনি লিখলেন, ছিল ‘রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপার, যাতে আমি জড়িত নই।’
লুসি চেস্টার দুই রায়েই একই ক্রম দেখতে পান, জনসংখ্যার আগে আলোচিত হয়েছে খাল, হেডওয়ার্কস, সড়ক, রেল আর বন্দর।
বাংলার জন্য র্যাডক্লিফ সাতটা প্রশ্ন তালিকাভুক্ত করেছিলেন। তাতে ছিল কলকাতা কার ভাগে যাবে আর শহরের বন্দরের জন্য নদিয়ার নদীগুলোর কতটা নিয়ন্ত্রণ দরকার। আরেকটা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম, যেখানে তিনি মুসলিম জনসংখ্যা ধরেছিলেন ৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম জেলা থেকে আলাদা রাষ্ট্রে যেতে পারে কি না। তিনি যোগ করলেন, ‘আমাদের কার্যপরিধির শর্তে রেল আর নদীতে কিছু বিঘ্ন না ঘটিয়ে সীমানা আঁকা একেবারেই অসম্ভব।’
লাহোর নিয়ে বিচারক দীন মুহাম্মদ লিখেছিলেন, পশ্চিম পাঞ্জাবকে তা থেকে বঞ্চিত করা ‘একটা জীবন্ত দেহ থেকে তার হৃদয় ছিনিয়ে নেওয়ার সমান হবে।’ ১৯৭১ সালে লন্ডনে সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারকে র্যাডক্লিফ বলেছিলেন, ‘আমি প্রায় তোমাদের লাহোর দিয়েই দিচ্ছিলাম,’ আর তিনি তা পাকিস্তানকে দিয়েছিলেন কারণ কলকাতা ভারতের ভাগে গেলে পাকিস্তানের ‘কোনো বড় শহর থাকত না।’ এটা একটা কথোপকথনের নায়ারের বিবরণ, যাচাই করার মতো কোনো নোট নেই।
গুরদাসপুর আর কাশ্মীরের পথ
১১ আগস্টের মধ্যে মাউন্টব্যাটেনের চিফ অফ স্টাফ লর্ড ইসমের হাতে এসেছিল লিয়াকত আলি খানের একটা মৌখিক বার্তা, যা এনেছিলেন পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সচিব মোহাম্মদ আলি। গুরদাসপুর জেলা ‘বা তার একটা বড় অংশও’ পূর্ব পাঞ্জাবে গেলে পাকিস্তান দেখবে ‘একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিচারিক নয়,’ আর একটা বিশ্বাসভঙ্গ, যা ‘পাকিস্তান আর ব্রিটিশদের ভবিষ্যৎ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বিপন্ন করতে পারে।’ ইসমে জবাব দিলেন, ভাইসরয় নিজেও রায় পাননি, আর কমিশনগুলোর সঙ্গে ভাইসরয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
রায়ে গুরদাসপুর, বাটালা আর পাঠানকোট তহসিল (উপ-জেলা) ভারতকে আর শকরগড় তহসিল পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিল। একটা অভিযোগ, যে ভারতকে কাশ্মীরের একটা পথ দিতে রেখাটাকে বাঁকানো হয়েছিল, তা আগের কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা যায়। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুসলিম এলাকার একটা নকশা আঁকতে বলা হলে তৎকালীন ভাইসরয় ওয়াভেল লন্ডনে তার করেছিলেন যে ‘ভৌগোলিক কারণে গুরদাসপুর অমৃতসরের সঙ্গেই যাবে,’ কারণ অমৃতসর, ‘শিখদের পবিত্র নগরী হওয়ায়,’ পাকিস্তানের বাইরে থাকা চাই।
অমিত কৃষাণকান্ত পল, ThePrint-এ লিখে, যোগ করেছেন যে মুসলিম লিগের কৌঁসুলি জাফরুল্লাহ খান তর্কের একক হিসেবে তহসিলকে বেছে নিয়েছিলেন। জাফরুল্লাহ খানের স্মৃতিকথায়, পলের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, সেই পছন্দে পাকিস্তান ফিরোজপুর আর জিরা তহসিল পেত আর অমৃতসরকে ঘিরে ফেলত, কিন্তু তাতে ঝুঁকি ছিল গুরদাসপুর জেলার, যা অস্থায়ী সীমানায় পাকিস্তানের ভাগে রাখা হয়েছিল। পল বিচারপতি মুনিরের ১৯৬০ সালের একটা বিবৃতিও উদ্ধৃত করেন, যে তিনি আর দীন মুহাম্মদ ‘একেবারে শুরু থেকেই’ জানতেন গুরদাসপুর ভারতে যাবে। পল এক পক্ষের হয়ে যুক্তি দিচ্ছেন, আর দুটো সূত্রের কোনোটাই আমরা নিজেরা দেখিনি। নায়ারের কাছে র্যাডক্লিফের নিজের অস্বীকার ছিল সোজাসাপ্টা: ‘আমি কাশ্মীরের কথা জানতামই না।’ জিন্নাহ রায়কে বলেছিলেন ‘অন্যায়, দুর্বোধ্য আর এমনকি বিকৃত,’ আর একই সঙ্গে মুসলমানদের তা মেনে নিতে বলেছিলেন। ক্যাম্পবেল-জনসনের ডায়েরিতে এই বাক্যাংশ আছে ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বরে, আর পল জিন্নাহর একটা বেতার ভাষণের তারিখ দেন ৩০ অক্টোবর। প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধের নিজস্ব লেখা আছে।
ফিরোজপুরের মানচিত্র
৮ আগস্ট মাউন্টব্যাটেনের ব্যক্তিগত সচিব জর্জ অ্যাবেল পাঞ্জাবের গভর্নরের সচিবকে একটা মানচিত্র আর র্যাডক্লিফের ব্যক্তিগত সচিব ক্রিস্টোফার বোমন্টের একটা নোট পাঠালেন, যাতে দেখানো ছিল ‘মোটামুটি সেই সীমানা, যা স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ চিহ্নিত করার প্রস্তাব দিচ্ছেন।’ সম্পাদকরা বলেন, ফাইলে তার কোনো কপি টিকে নেই, যদিও ১৯৬৮ সালের পাকিস্তান সরকারের একটা চিঠি বলে তাদের কাছে দুটোই আছে। গভর্নর ইভান জেনকিন্স ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে সেগুলোর বর্ণনা দিয়েছিলেন এই বলে যে তাতে ‘ফিরোজপুর জেলায় একটা তীক্ষ্ণ উদ্গত অংশ’ দেখানো ছিল যা ‘ফিরোজপুর আর জিরা তহসিলকে পুরোটাই’ পাকিস্তানে ঘিরে ফেলেছিল। জেনকিন্স লিখেছেন, ১০ বা ১১ আগস্টের কাছাকাছি, ভাইসরয়ের ভবন থেকে এক বার্তা তাঁকে বলল: ‘উদ্গত অংশটা বাদ দাও।’
মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে ইসমেকে বললেন, অ্যাবেল ‘আমার অজান্তেই সংশ্লিষ্ট চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন’ আর এটা ‘একটা অদ্ভুত পদ্ধতি বলে মনে হবে।’ একই সময়ে চাপ আসছিল। ৯ আগস্ট নেহরু কেন্দ্রীয় জলপথ, সেচ আর নৌচলাচল কমিশনের চেয়ারম্যান এ. এন. খোসলার একটা নোট পাঠালেন, যাতে বলা ছিল ফিরোজপুর পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক।’ ১০ আগস্টের একটা তারে, যা পরের এক স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, বিকানিরের মহারাজা বললেন ফিরোজপুর হেডওয়ার্কস তাঁর রাজ্যের গঙ্গা খালকে জল জোগায়। মাউন্টব্যাটেন খোসলার নোট পাঠাতে রাজি হলেন না, ১০ আগস্ট লিখলেন যে তিনি ‘সীমানা কমিশনের স্বাধীনতার ক্ষতি করবেন না,’ আর ১১ আগস্ট বিকানিরকে বললেন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর ‘একেবারেই কোনো সম্পর্ক নেই।’ রায়ে ফিরোজপুর আর জিরা তহসিল ভারতের কাছেই রইল।
পিপ্পা বিরদির লুসি চেস্টারের বইয়ের পর্যালোচনা জানায়, বোমন্টের ধারণা মাউন্টব্যাটেন গুরদাসপুরের রেখাকে আকার দেননি, আর র্যাডক্লিফ ‘ফিরোজপুর নিয়ে তাঁর মতামত দ্বারা নিশ্চিতভাবেই প্রভাবিত হয়েছিলেন।’ নায়ারকে র্যাডক্লিফ বলেছিলেন, নায়ারের বিবরণে, রেখা নিয়ে তাঁর উপর কোনো চাপ ছিল না, ছিল শুধু কাজ শেষ করার চাপ। কাগজপত্র দেখায় মানচিত্রের কথা কে জানত আর বার্তাটা কে পাঠিয়েছিল, কিন্তু রেখা কে বদলেছিল তা নয়।
পার্বত্য এলাকা, দার্জিলিং আর সিলেট
বাংলার দিকের সংকটের কেন্দ্র ছিল পার্বত্য এলাকা। মাউন্টব্যাটেনের প্রতিবেদন বলছে, ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় তাঁর সংস্কার কমিশনার ভি. পি. মেনন তাঁকে সতর্ক করেছিলেন যে নেহরু আর প্যাটেল ‘দুজনেই নিশ্চিতভাবে ফেটে পড়বেন,’ কারণ তাঁরা পার্বত্য এলাকার একটা প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন যে এলাকাটা পাকিস্তানে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মেনন স্বীকার করলেন, মাউন্টব্যাটেন যোগ করলেন, ‘যে এমন কথা বলার তাঁদের কোনো সম্ভাব্য কর্তৃত্বই ছিল না।’ মাউন্টব্যাটেন লিখলেন, প্যাটেলের একটা চিঠি ইঙ্গিত দেয় যে পার্বত্য এলাকার মানুষ ‘এই রায় বলপ্রয়োগে প্রতিরোধ করলে ন্যায্য হবে,’ আর সেটাকে ‘এতই অবিশ্বাস্য’ বলে তিনি তার একটা কপি সংযুক্ত করলেন।
১৬ আগস্ট নেহরু সভায় বললেন, এলাকাটা একটা বর্জিত এলাকা, যার মানুষ প্রায় ৯৭ শতাংশ বৌদ্ধ আর হিন্দু। মাউন্টব্যাটেন জবাব দিলেন, কর্ণফুলী নদী আর চট্টগ্রামের অর্থনীতি তাদের পূর্ব বাংলার সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। মুসলিম লিগের ফজলুর রহমান বললেন, ‘সংলগ্নতা’র ধারা পার্বত্য এলাকাকে পশ্চিম বাংলায় যেতেই দিত না। লিয়াকত আলি খান, কার্যবিবরণী অনুযায়ী, যুক্তি দিলেন যে র্যাডক্লিফ ‘তাঁর কার্যপরিধির মৌলিক ভিত্তিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন।’
র্যাডক্লিফের তৃতীয় রায়, যার তারিখ ১৩ আগস্ট, সিলেটকে ভাগ করল গণভোটে তা পূর্ব বাংলায় যাওয়ার পর। কাছাড়ের হাইলাকান্দি এলাকা, যেখানে মুসলমান ছিল ৫১ শতাংশ, পূর্ব বাংলাকে দিলে সিলেটের ছয়টা অমুসলিম থানা-এলাকা ‘অসমের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন’ হয়ে পড়ত আর একটা রেলপথ কাটা পড়ত। তাই তিনি এলাকা বদলাবদলি করলেন। কিছু অমুসলিম এলাকা গেল পূর্ব বাংলায়, আর হাইলাকান্দি আর করিমগঞ্জের চারপাশের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জমি রইল অসমে।
ড্রয়ারে পাঁচ দিন
নেতারা চেয়েছিলেন গতি। ২০ জুলাই পাঞ্জাব দেশভাগ কমিটিতে কার্যবিবরণীতে আছে মাউন্টব্যাটেন ব্যাখ্যা করছেন যে ‘কেন্দ্রে সব দলের নেতারা জোর দিয়েছিলেন’ যেন রায় ১৫ আগস্টের আগে প্রকাশ পায়। দুদিন পরে তিনি র্যাডক্লিফকে লিখলেন, ‘আপনি যত বাড়তি দিন আগে পারেন, তার জন্য আমরা সবাই কৃতজ্ঞ থাকব,’ আর জানতে চাইলেন ১০ তারিখ সম্ভব কি না। র্যাডক্লিফ ১২ তারিখের কথা দিলেন। ২১ জুলাই জেনকিন্স রায়ের আগাম খবর চেয়েছিলেন, বলেছিলেন ‘কয়েক ঘণ্টার আগাম সংকেতও কিছু না থাকার চেয়ে ভালো।’ ৯ আগস্ট এক কর্মী-সভায় মাউন্টব্যাটেন তুললেন সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করা হবে কি না, কারণ যত আগে বেরোবে, বিশৃঙ্খলার দায় তত বেশি ব্রিটিশদের ঘাড়ে পড়বে।
এরপর কী ঘটল, তা নিয়ে ১৬ আগস্টের তাঁর প্রতিবেদন স্পষ্ট। র্যাডক্লিফ ১২ আগস্ট তাঁকে বললেন রায় পরদিন দুপুরের মধ্যে তৈরি হবে। ‘নিছক প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে,’ মাউন্টব্যাটেন লিখলেন, আগে প্রকাশের কিছু সুবিধা ছিল। ‘তবে গোড়া থেকেই স্পষ্ট ছিল যে প্রকাশ যত পিছিয়ে দেওয়া যায়, অনিবার্য ক্ষোভ ততই কম গিয়ে পড়বে ব্রিটিশদের উপর।’ তিনি ‘ইচ্ছে করেই’ বাংলার রায় পড়া থেকে ‘বিরত’ ছিলেন। মেননের সতর্কবার্তা তাঁকে মন স্থির করাল: ‘কোনোভাবে আমাদের ১৫ আগস্টের পর পর্যন্ত নেতাদের রায়ের খুঁটিনাটি জানা থেকে ঠেকাতে হবে।’
ক্যাম্পবেল-জনসনের ডায়েরি একটা ব্যবহারিক কথা যোগ করে। ১২ আগস্ট তিনি আর জন ক্রিস্টি র্যাডক্লিফের কাছে গিয়ে দেখলেন সিলেটের রায় অসমাপ্ত। মাউন্টব্যাটেন ১৪ আগস্ট করাচি থেকে ফেরার আগে তিনটের সবকটা তাঁর কাছে পৌঁছোনো ‘শারীরিকভাবে খুবই কঠিন’ হত, আর পাঠ ১৬ তারিখের আগে ছাপাও যেত না। এই তৈরি-করা সমাধান হাতে পেয়ে মাউন্টব্যাটেন ‘ভীষণ স্বস্তি পেয়েছিলেন।’
তিনি ১৩ আগস্ট করাচি উড়ে গেলেন আর বিভক্ত প্রদেশের গভর্নরদের বললেন রায় বেরোনো পর্যন্ত অস্থায়ী সীমানা অবধি শাসন চালাতে। ১৬ আগস্টের সভায় লিয়াকত আলি খান চাইলেন রায় ‘যেমন আছে তেমনই প্রকাশ’ হোক। নেহরু বললেন তিনি আর তাঁর সহকর্মীরা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এক নৈতিক অচলাবস্থা’ বোধ করছেন। ক্যাম্পবেল-জনসন লিখে রেখেছেন মাউন্টব্যাটেন যে নৈতিক শিক্ষা টেনেছিলেন: ‘এর ন্যায্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মনে হল তাঁদের অসন্তোষের নিঃসন্দেহ সমতাতেই।’ ১৭ আগস্ট একটা অতিরিক্ত গেজেটে রায়গুলো ছাপা হলো।
গুজব কী করেছিল
মাউন্টব্যাটেনের প্রতিবেদন সারসংক্ষেপ দিয়েছে, সর্বাধিনায়ক অকিনলেক ১৪ তারিখে পাঞ্জাব ঘুরে এসে ১৬ আগস্ট মন্ত্রীদের কী বলেছিলেন। তা শুরু হয়: ‘পাঞ্জাবে সীমানা কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে গুজবই বড় আকারে দাঙ্গা শুরু করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।’ অমৃতসরের আশেপাশে, অকিনলেক বললেন, শিখ সশস্ত্র দল ‘প্রতি রাতে তিন-চারটা করে’ মুসলিম গ্রামে হামলা চালাচ্ছিল। লাহোর জেলার মুসলিম দলগুলো ছিল ‘সংখ্যায় কম’ আর ‘কম সংগঠিত।’ ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পাঞ্জাবে বেসামরিক হতাহত ‘ধরা হয়েছিল প্রায় ১,৫০০ নিহত আর আহত।’
একই সভায় প্যাটেলের মত, কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ছিল পাঞ্জাবের রায়ের একমাত্র উত্তর ‘বৃহৎ আকারে জনসংখ্যা বিনিময়।’ সবাই একমত হলেন যে বিজ্ঞপ্তিতে এমন কোনো প্রস্তাবের উল্লেখ থাকবে না।
মৃতদের কেউ গোনেনি। ইয়াসমিন খান, The Great Partition-এ, লিখেছেন কমপক্ষে এক মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়েছিল আর দশ থেকে পনেরো মিলিয়ন মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
র্যাডক্লিফ বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন যা
‘আমার কোনো বিকল্প ছিল না; আমার হাতে সময় এতই কম ছিল যে আমি আরও ভালো কাজ করতে পারিনি,’ র্যাডক্লিফ ১৯৭১ সালে নায়ারকে বলেছিলেন। জনপ্রিয় বিবরণে বলে, তিনি তাঁর ৪০,০০০ টাকার ফি নিতে অস্বীকার করেছিলেন আর তাঁর কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। ফির গল্প দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় স্তরের লেখার উপর, আর আমরা এর কোনো সংরক্ষণাগারের নথি পাইনি।
The Transfer of Power-এর সম্পাদকরা কাগজপত্রের প্রশ্নটার নিষ্পত্তি করেছেন র্যাডক্লিফের প্রতিবেদনগুলোর একটা পাদটীকায়। তাঁরা লিখেছেন, তিনি একটা চিঠিতে নিশ্চিত করেছিলেন, যা এখন ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস রিসার্চ ডিপার্টমেন্টে রাখা আছে, ‘যে তিনি সীমানা কমিশনের কার্যক্রম সংক্রান্ত নিজের নোট আর খসড়া নষ্ট করে ফেলেছিলেন আর আসলে ভারত থেকে এ ধরনের কিছুই বাড়িতে আনেননি।’ আরেকটা পাদটীকা বলে, তাঁর রায়ের সঙ্গে জোড়া আসল মানচিত্রগুলোর খোঁজ মেলেনি, আর খণ্ডে ছাপা মানচিত্রগুলো এসেছে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরের তারিখযুক্ত মাউন্টব্যাটেনের নিজের ভাইসরয়-পদ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে।
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
- The Transfer of Power 1942-7, Volume XII: The Mountbatten Viceroyalty, 8 July to 15 August 1947 (HMSO, 1983), including Radcliffe's reports (Appendices to No. 488), Mountbatten's Personal Report No. 17 (No. 489) and the minutes of 16 August (No. 487), Internet Archive
- The Transfer of Power 1942-7, Volume X: The Mountbatten Viceroyalty, 22 March to 30 May 1947, editors' introduction, Internet Archive
- The Transfer of Power 1942-7, Volume VI: Wavell to Pethick-Lawrence, telegram of 7 February 1946 (No. 406), Internet Archive
- Hansard, House of Lords, 20 February 1947: Indian Policy (the statement fixing June 1948)
- Hansard, House of Commons, 3 June 1947: India (Transfer of Power), Attlee's statement
- Hansard, House of Commons, 10 July 1947: Indian Independence Bill, second reading (Attlee and Harold Macmillan)
- Alan Campbell-Johnson, Mission with Mountbatten (1951), Internet Archive
- Kuldip Nayar, 'I nearly gave you Lahore', excerpt from Scoop! (HarperCollins India), Scroll.in
- Muhammad Abrar Zahoor, 'Radcliffe and the partition of Punjab', The News on Sunday (Pakistan), 14 August 2022
- Pippa Virdee, review of Lucy Chester, Borders and Conflict in South Asia, Reviews in History, Institute of Historical Research (November 2010)
- Lucy Chester, 'Water was the key: Radcliffe's private deliberations', chapter abstract, Borders and Conflict in South Asia (Manchester University Press), Cambridge Core
- Amit Krishankant Paul, 'Pakistan created a Gurdaspur myth for way too long', ThePrint, 7 October 2025
- R. K. Kaushik, 'The lead-up to the Radcliffe Award', The Tribune, 16 July 2019
- 'Partition boundary awards delay, 13 to 17 August 1947', Constitution of India
- Yasmin Khan, The Great Partition (Yale University Press, 2007), summary at the 1947 Partition Archive
এই লেখাটি AI সরঞ্জামের সহায়তায় গবেষণা ও রচনা করা হয়েছে এবং নির্ভুলতার জন্য সম্পাদনা করা হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ তথ্য ও আলোচনার জন্য, পেশাদার পরামর্শ নয়। আমাদের সম্পাদকীয় মান ও দাবিত্যাগ দেখুন। কোনো ভুল চোখে পড়ল? আমাদের জানান।
ভালো লাগল? পরেরটিও পড়ুন।
একবারে একটি ভালো লেখা, সরাসরি আপনার ইনবক্সে। কোনো স্প্যাম নয়, যখন খুশি বন্ধ করতে পারেন।