অলঙ্করণ: tuput
বাংলা
১৯৭৪ সালের পরীক্ষাকে ঘোষণা করা হয়েছিল প্রায় ১২ কিলোটনের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ হিসেবে। ১৯৯৮ সালের ধারাটি ঘোষিত হয় পাঁচটি যন্ত্র হিসেবে, সবচেয়ে বড়টি ৪৩ কিলোটনের থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ। ১৯৯৮ সালের সংখ্যা নিয়ে ভূকম্পবিজ্ঞানীরা আর ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র কয়েক মাসের মধ্যেই মতভেদে যান, আর পরীক্ষাস্থলের একজন প্রাক্তন বিজ্ঞানী ২০০৯ সালে তর্কটি আবার খুলে দেন।
১৯৭৪ সালের ১৮ মে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের বিস্ফোরণ দলের সদস্য পি. আর. দাস্তিদার রাজস্থানের মরুভূমির নিচে পোখরানের কাছে প্রায় ১০০ মিটার গভীরে একটি প্লুটোনিয়াম ইমপ্লোশন যন্ত্র ছোড়ার বোতাম টেপেন। পরমাণু শক্তি দপ্তর (ডিএই) এর ক্ষমতা অনুমান করে প্রায় ১২ কিলোটন, আর সরকার ঘটনাটিকে বলে ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ’। ২৪ বছর পরে, ১৯৯৮ সালের ১১ মে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একই পরিসরে তিনটি ভূগর্ভস্থ পরীক্ষার কথা ঘোষণা করেন, আর ১৩ মে আরও দুটি সরকারের ভাষায় পরিকল্পিত ধারা শেষ করে।
এক কিলোটন হল ১,০০০ টন টিএনটির বিস্ফোরণ-শক্তি। পোখরানের দুই তারিখেরই সরকারি কিলোটন সংখ্যা বিতর্কিত, আর এই লেখায় প্রতিটি বিতর্কিত সংখ্যা তাঁর বা সেই সংস্থার নামে দেওয়া হয়েছে যিনি বা যারা তা বলেছেন। দুই তারিখের পেছনের কর্মসূচিটি শুরু হয়েছিল হোমি ভাবার অধীনে, যাঁর কর্মজীবন আলোচিত হয়েছে হোমি ভাবা ও পরমাণু কর্মসূচি লেখায়।
১৯৭৪ সালের ১৮ মে সকালে ভারত বিশ্বকে কী বলেছিল
সকাল প্রায় ১০টায় পররাষ্ট্রসচিব কেওয়াল সিং নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসে ফোন করেন। মার্কিন কূটনৈতিক নথি থেকে নেওয়া জয়িতা সরকারের বিবরণে তিনি বলছেন, পরমাণু শক্তি কমিশন একটি ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ’ চালিয়েছে, যাতে খনন আর মাটি সরানোর মতো কাজে প্রযুক্তিটির সঙ্গে ভারত তাল মিলিয়ে চলতে পারে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ডেভিড স্নাইডার জবাব দেন, ওয়াশিংটন খবরটি ‘যথেষ্ট ধাক্কার’ সঙ্গে নেবে।
গর্তটি খুঁড়েছিল সেনাবাহিনীর ৬১ ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্ট, যাদের সম্পর্কে জয়িতা সরকার লিখেছেন, প্রথমে ভাবা কেন্দ্রের পরিচালক রাজা রামান্না জানিয়েছিলেন কাজটা একটা ‘ভূকম্পীয় পরীক্ষা’। কাছের গ্রামবাসীদের বলা হয়েছিল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কমিশন তেলের সন্ধান করছে। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে একটি শুকনো গর্ত ধসে একজন মারা যান, আর ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকৌশলীরা জলস্তরে আঘাত করায় আরেকটি গর্ত জলে ভরে যায়, ফলে নতুন একটি খুঁড়তে হয়েছিল।
বিদারণযোগ্য পদার্থ ছিল সাইরাস গবেষণা চুল্লি থেকে পাওয়া প্লুটোনিয়াম, যার জোগানে কানাডা সাহায্য করেছিল আর ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভারী জল দিয়েছিল, জয়িতা সরকার ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ অনুযায়ী। ক্যারি সাবলেটের নিউক্লিয়ার উইপন আর্কাইভ তালিকাভুক্ত করেছে রামান্নাকে দলনেতা, পি. কে. আয়েঙ্গারকে দ্বিতীয় নেতা, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) বি. ডি. নাগ চৌধুরীকে সমন্বয়কারী, আর আর. চিদম্বরমকে পারমাণবিক নকশার প্রধান হিসেবে, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে জড়িত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী ৭৫ জনের বেশি নয়।
‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ নামটি এসেছে তারিখ থেকে, সেদিন ছিল বুদ্ধ পূর্ণিমা। জয়িতা সরকার লিখেছেন, রামান্না নাকি অরক্ষিত লাইন থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ফোন করে বলেছিলেন ‘বুদ্ধ হাসছেন’। সাবলেট জানাচ্ছেন, পরীক্ষার আগে এর কোনো আনুষ্ঠানিক সংকেতনাম ছিল না আর ডাকনামটির উৎস বিতর্কিত। ১৯৭৪ সালের ২৮ মে গান্ধী ভারতকে বলেছিলেন ‘একটি পারমাণবিক দেশ, পারমাণবিক অস্ত্রের দেশ নয়’। সাবলেটের বর্ণনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে রামান্না বলেছিলেন, পরীক্ষাটা ‘অতটাও শান্তিপূর্ণ ছিল না’।
পরীক্ষাটি কেন তখন হল, তা নিয়েও ইতিহাসবিদদের মতভেদ আছে। জয়িতা সরকার লিখেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা আর রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মইনিহান একে দেখেছিলেন ১৯৭৪ সালের মে মাসের রেল ধর্মঘট সহ অভ্যন্তরীণ অশান্তি থেকে নজর সরানোর চেষ্টা হিসেবে। জয়িতা সরকারের নিজের পাঠ হল, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর গান্ধী রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী থাকাকালে, ১৯৭২ সালের শরতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়, আর তিনি যোগ করেছেন, সেই সিদ্ধান্তের কোনো কাগজপত্রের সূত্র পাওয়া যায়নি। তিনি এও লিখেছেন যে বিক্রম সারাভাই ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে ভিয়েনার এক সম্মেলনে বলেছিলেন যে ডিএই এমন বিস্ফোরক যন্ত্রের প্রকৌশল নিয়ে কাজ করছে।
১২ কিলোটন, ৮ থেকে ১০, না ৪ থেকে ৬
ডিএইর সংখ্যা ছিল ‘প্রায় ১২ কিলোটন’। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিয়ে এক প্রযুক্তিগত সভায় রামান্না ও চিদম্বরম ভাবা কেন্দ্রের একটি সমীক্ষা পেশ করেন, যাতে ছিল ১২ কিলোটন, ৫.০ মাত্রার ভূকম্পীয় পাঠ আর ৪৭ মিটার ব্যাসার্ধ ও ১০ মিটার গভীরতার একটি গহ্বর। সমীক্ষায় বলা হয়েছিল কোনো তেজস্ক্রিয়তা বেরোয়নি, যে দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জয়িতা সরকার উল্লেখ করেছেন।
জয়িতা সরকার লিখেছেন, প্রকৃত ক্ষমতা ‘বিতর্কিত হয়ে উঠবে’, আর তা ধরা হয়েছে ৮ থেকে ১২ কিলোটনের মধ্যে। সাবলেটের অনুমান-সারণিতে আয়েঙ্গার ৮ থেকে ১০ কিলোটন, মার্কিন ভূকম্পবিজ্ঞানী টেরি ওয়ালেস ১৯৯৮ সালে ৪ থেকে ৬ কিলোটন, আর ভারতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে ২ থেকে ২০ পর্যন্ত। সাবলেট বলছেন, ১৯৭৪ সালে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হোমি সেথনা আর আয়েঙ্গার দুজনেই মেনে নিয়েছেন যে ১২ কিলোটন বাড়িয়ে বলা ছিল।
সরবরাহকারীদের ক্লাব আর সংযমের বছরগুলো
ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের নথি দেখায় হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালে সংবেদনশীল পারমাণবিক প্রযুক্তির রপ্তানির সাধারণ নিয়ম ঠিক করতে একটি গোপন প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছিলেন। সরবরাহকারীদের প্রথম সভা হয় ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে লন্ডনে। প্রতিষ্ঠাতা সাতটি দেশ ছিল কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, পশ্চিম জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন, এবং নির্দেশিকাগুলো প্রকাশ্যে আসে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন আইএইএ সেগুলো প্রকাশ করে। সেই গোষ্ঠীই পরে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ হয়ে ওঠে।
জয়িতা সরকারের মতে, পরীক্ষার পর কানাডা ভারতের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা স্থগিত করে, আর ১৯৭৬ সালের মে মাসে একটি নতুন চুক্তি প্রায় হয়ে ওঠা আলোচনাও বন্ধ করে দেয়। মার্কিন কংগ্রেস ভারতকে দেওয়া ভারী জল নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন জনতা সরকার প্রকাশ্যে বলে ভারত আর কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ চালাবে না, আর ভারতীয় কূটনীতিকেরা সিদ্ধান্তে আসেন যে সরবরাহকারীদের গোষ্ঠীর আমন্ত্রণ মানে খিড়কি দিয়ে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার একটি মার্কিন আইনে সই করেন, যা পারমাণবিক সাহায্য সীমিত করে সেই দেশগুলোর জন্য যারা আইএইএর পূর্ণ-পরিসর নিরাপত্তা-ব্যবস্থা, অর্থাৎ তাদের সব পারমাণবিক পদার্থ ও স্থাপনার পরিদর্শন, মেনে নেয়।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে তিনটি চেষ্টা
ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ, উইলিয়াম বার্র সম্পাদিত একটি লেখায়, বলছে মার্কিন গোয়েন্দারা ১৯৯৫ সালের নভেম্বরে পোখরানে পরীক্ষার প্রস্তুতির চিহ্ন ধরতে শুরু করে। লেখাটি বলছে বিশ্লেষকেরা উপগ্রহ-ছবিগুলোকে ‘কাদার মতো অস্বচ্ছ’ পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রদূত ফ্র্যাঙ্ক উইসনার ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিংহ রাওয়ের মুখ্য সচিব এ. এন. বর্মাকে একটি ছবি দেখান, আর প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ডিসেম্বরের মাঝামাঝি রাওয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আর্কাইভের সিদ্ধান্ত, রাও প্রস্তুতির অনুমতি দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ পদক্ষেপ নেননি, আংশিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নিজের দ্বিধার কারণে।
১৯৯৬ সালের আগস্টে বিরোধী দলের নেতা থাকাকালে বাজপেয়ী উইসনারকে বলেছিলেন, ‘যদি আমরা ভূগর্ভস্থ পরীক্ষা শুরু করি তাহলে কী হবে?’ আর্কাইভ যোগ করে, ১৯৯৬ সালে দুই সপ্তাহেরও কম প্রধানমন্ত্রী থেকে বাজপেয়ী পদ ছাড়লে একটি পরীক্ষা স্থগিত হয়। এ. পি. জে. আব্দুল কালাম ২০১১ সালে বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালের মে মাসে রাও তাঁকে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। কতদূর কী হয়েছিল তা নিয়ে বিবরণে অমিল আছে: সাবলেট লিখেছেন, বাজপেয়ী পরীক্ষা বাতিল করার আগে যন্ত্রগুলো পরীক্ষার গর্তে পৌঁছে গিয়েছিল, অথচ ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ কেবল বলছে তা স্থগিত হয়েছিল।
বাজপেয়ী আবার শপথ নেন ১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ। সাবলেটের পুনর্গঠন, যা সূত্র উল্লেখ করে না, অনুযায়ী তিনি ২০ মার্চ কালাম ও চিদম্বরমকে প্রস্তুত থাকতে বলেন, আর কালাম বলার পর যে একটি পরীক্ষায় প্রায় ৩০ দিন লাগে, ১১ মে ঠিক হয়। বাজপেয়ীর একান্ত সচিব শক্তি সিন্হা ২০১৮ সালে লিখেছিলেন যে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সঙ্গে পোখরানের সরাসরি টেলিযোগাযোগ ছিল, বাজপেয়ী একটি সংবাদ সম্মেলনে হিন্দি ও ইংরেজিতে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি পড়েছিলেন, আর ‘সেদিন ওই ঘরে অনেক চোখের জল ছিল।‘
১১ মে বাজপেয়ী কী ঘোষণা করেছিলেন আর ২৭ মে সংসদকে কী বলেছিলেন
বার্কলি সিসমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির সংরক্ষিত সংবাদ প্রতিবেদনে প্রতিলিপি করা ১১ মের বিবৃতি বলেছিল: ‘আজ ১৫৪৫ ঘণ্টায় ভারত পোখরান পরিসরে তিনটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে।’ তাতে একটি বিদারণ যন্ত্র, একটি নিম্নশক্তির যন্ত্র আর একটি থার্মোনিউক্লিয়ার যন্ত্রের তালিকা ছিল, আর বলা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের পরীক্ষার মতো বিস্ফোরণগুলো সীমাবদ্ধ ছিল। সেগুলোকে শান্তিপূর্ণ বলা হয়নি।
১৭ মে ডিএই ও ডিআরডিওর এক যৌথ বিবৃতি সংখ্যাগুলো দেয়: ১১ মে প্রায় ১২ কিলোটনের একটি বিদারণ যন্ত্র, প্রায় ৪৩ কিলোটনের একটি থার্মোনিউক্লিয়ার যন্ত্র আর এক কিলোটনের কম ক্ষমতার একটি যন্ত্র, তারপর ১৩ মে এক কিলোটনের কম ক্ষমতার দুটি যন্ত্র, ০.২ থেকে ০.৬ কিলোটনের। সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে চিদম্বরম বলেন, সবচেয়ে কাছের গ্রাম খেতোলাই ৫ কিমি থেকে সামান্য বেশি দূরে এবং এই দূরত্বই মোট ক্ষমতা ঠিক করে দিয়েছে।
২৭ মে বাজপেয়ী সংসদকে বলেন: ‘ভারত এখন একটি পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র। এটা এমন বাস্তবতা যা অস্বীকার করা যায় না।’ তিনি যোগ করেন, ‘আগ্রাসনের জন্য বা কোনো দেশের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার জন্য এই অস্ত্র ব্যবহারের ইচ্ছা আমাদের নেই।’ স্থগিতাদেশের ঘোষণা একই বিবৃতিতে আছে: ‘ভারত এখন স্বেচ্ছায় স্থগিতাদেশ পালন করবে এবং ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা বিস্ফোরণ চালানো থেকে বিরত থাকবে’, আর তিনি বলেন সরকার তা আইনে বাধ্যতামূলক করতে ইচ্ছুক।
‘প্রথম ব্যবহার নয়’ কথাটি সেই বিবৃতিতে নেই। একই দিনে সংসদে রাখা কাগজ, ভারতের পারমাণবিক নীতির বিবর্তন, ১৯৯৪ সালের ভারতের প্রস্তাব মনে করিয়ে দেয় যে ভারত ও পাকিস্তান যৌথভাবে প্রতিশ্রুতি দেবে একে অপরের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র আগে ব্যবহার করবে না, আর বলে সরকার সেই দেশ ও অন্যদের সঙ্গে প্রথম-ব্যবহার-নয় চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতির কথা পুনরায় বলেছে। একতরফা অবস্থান আছে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের ১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্টের খসড়া নীতিতে: ‘ভারত প্রথমে পারমাণবিক হামলা শুরু করবে না, কিন্তু প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে শাস্তিমূলক প্রত্যাঘাত করবে।‘
দাবি করা ক্ষমতা আর মাপা ক্ষমতা
১১ মে বিদারণ যন্ত্রের জন্য প্রায় ১২ কিলোটন আর থার্মোনিউক্লিয়ার যন্ত্রের জন্য প্রায় ৪৩ কিলোটনের দাবি, নিম্নশক্তির যন্ত্রটি গোনার আগেই, মোটামুটি ৫৫ কিলোটন বোঝায়। বাইরের ভূকম্পবিজ্ঞানীরা মেপেছিলেন অনেক কম। ভাবা কেন্দ্রের নিজের ১৯৯৮ সালের নভেম্বরের নিউজলেটার, সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে, ১১ মে-র তিনটি বিস্ফোরণের জন্য টেরি ওয়ালেসকে ১০ থেকে ১৫ কিলোটন বলে তালিকাভুক্ত করেছে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষার ৫.২ মাত্রার বডি-ওয়েভ (একটি ভূকম্পীয় স্কেল) থেকে, আর ব্রায়ান বার্কার ও সহকর্মীদের ৯ থেকে ১৬ কিলোটন, পরীক্ষা-নিষেধ চুক্তির পর্যবেক্ষণ-তথ্য প্রক্রিয়াকরণকারী আন্তর্জাতিক ডেটা সেন্টারের জানানো ৫.০ মাত্রা থেকে। বার্কারের দল ১৩ মের বিস্ফোরণগুলোকে ৩০ থেকে ৩০০ টন বলেছে।
ভাবা কেন্দ্রের লেখকেরা, এস. কে. সিক্কা, ফাল্গুনী রায়, জি. জে. নায়ার, ভি. জি. কোলভাঙ্কার আর অনিল কাকোদকর, সংশোধিত ৫.৩৯ মাত্রা আর ১৯৭৪ সালের পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করে ৫৮ কিলোটনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, ৫ কম-বেশি। দ্য হিন্দু ২০০৯ সালে জানায়, ভাবা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা থার্মোনিউক্লিয়ার পরীক্ষার ক্ষমতা হিসাব করেছিলেন ৫০ কিলোটন, ১০ কম-বেশি, আর বিস্ফোরণের পর নেওয়া নমুনায় সোডিয়াম-২২ ও ম্যাঙ্গানিজ-৫৪ পাওয়া গিয়েছিল, যা শুধু বিদারণের নয়, ফিউশনের উপজাত। চিদম্বরম বলেছেন, পশ্চিমা ভূকম্পবিজ্ঞানীরা স্থানীয় ভূতত্ত্ব উপেক্ষা করায় কম অনুমান করেছেন, আর ১৩ মের বিস্ফোরণ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে আসেনি কারণ সেখানে শনাক্তকরণের সীমা বেশি।
অন্যেরা দুই শিবিরের মাঝামাঝি। সাবলেটের নিজের বিশ্লেষণে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ প্রায় ৩১ কিলোটন। সাবলেটের কথায়, ২০০০ সালে আয়েঙ্গার বলেছিলেন সেই যন্ত্রের দ্বিতীয় ধাপ কাজ করেছিল শুধু আংশিকভাবে, আর ভাবা কেন্দ্র তা অস্বীকার করেছিল। ২০০৯ সালের আগস্টে পোখরান-২-এ ডিআরডিওর দলের প্রতিনিধি কে. সন্তানম বলেছিলেন, থার্মোনিউক্লিয়ার ক্ষমতা ‘দাবির চেয়ে অনেক কম’। চিদম্বরম, তখন সরকারের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা, দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে জবাব দেন যে এমন অভিযোগে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ লাগে।
১৯৯৮ সালের নিষেধাজ্ঞা আর তা কীভাবে তোলা হল
প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ১৯৯৮ সালের ১৩ মে প্রেসিডেন্সিয়াল ডিটারমিনেশন ৯৮-২২ সই করেন, যাতে সিদ্ধান্ত ছিল ভারত ‘১৯৯৮ সালের ১১ মে একটি পারমাণবিক বিস্ফোরক যন্ত্র বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে’। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে শাস্তির তালিকা দিয়েছে: বেশিরভাগ বিদেশি সাহায্য, অস্ত্র বিক্রি আর সামরিক অর্থায়ন বন্ধ, মার্কিন সরকারি ঋণে নিষেধ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণে মার্কিন বিরোধিতা, সরকারকে মার্কিন ব্যাংক ঋণে নিষেধ, আর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকও ভারতের জন্য নতুন অর্থায়ন বন্ধ করে। জি-এইট দেশগুলো ওই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মৌলিক-চাহিদা-বহির্ভূত ঋণ পিছিয়ে দিতে রাজি হয়।
১৭ মে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কালাম বলেছিলেন: ‘প্রযুক্তিগতভাবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি।’ আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন জানাচ্ছে, উপ-পররাষ্ট্রসচিব স্ট্রোব ট্যালবট পাঁচটি লক্ষ্য ঠিক করেন, তার মধ্যে ছিল সামগ্রিক পরীক্ষা-নিষেধ চুক্তিতে সই আর বিদারণযোগ্য পদার্থ উৎপাদন বন্ধ, আর ভারত ও পাকিস্তান ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে বলে তারা ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা-নিষেধ চুক্তিতে সই করবে। বিদারণযোগ্য পদার্থ বা ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা কেউই মানেনি।
স্বস্তি এসেছিল ধাপে ধাপে। কংগ্রেস ১৯৯৮ সালের ২১ অক্টোবর ভারত-পাকিস্তান রিলিফ অ্যাক্ট পাস করে, আর ক্লিনটন ১৯৯৮ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে তা কাজে লাগিয়ে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ও ওভারসিজ প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনের সহায়তা ফিরিয়ে আনেন আর মার্কিন ব্যাংকের ওপর সীমা তুলে নেন, যদিও অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধই থাকে। ১৯৯৯ সালের ২৫ অক্টোবরের একটি আইন প্রেসিডেন্টকে সময়সীমা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা মকুব করতে দেয়, আর ২০০১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশ ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের জন্য প্রতিরক্ষা-বিক্রি, প্রযুক্তি ও সামরিক-অর্থায়নের নিষেধাজ্ঞা এবং বাকি সবগুলো মকুব করেন, কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস জানাচ্ছে।
২০০৩ সালের ৪ জানুয়ারি ঘোষিত নীতি
২০০৩ সালের ৪ জানুয়ারি নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ভারতের পারমাণবিক নীতির একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে। তাতে আছে ‘বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম প্রতিরোধ’, প্রথম ব্যবহার না করার অবস্থান, যার অধীনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হবে শুধু ভারতীয় ভূখণ্ডে বা যে কোনো জায়গায় ভারতীয় বাহিনীর ওপর পারমাণবিক হামলার প্রত্যাঘাতে, আর এমন প্রত্যাঘাত যা ‘ব্যাপক হবে এবং অগ্রহণযোগ্য ক্ষতি ঘটানোর জন্য নকশা করা’। কেবল বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পারমাণবিক কমান্ড কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে, তা অনুমোদন করতে পারে। সেই নীতি আজ সন্ত্রাসী হামলায় ভারতের জবাবের পেছনে কীভাবে আছে, তা আলোচিত হয়েছে ভারত কীভাবে হামলার জবাব দেয় লেখায়।
একই বিবৃতিতে বলা আছে ভারত পারমাণবিক অস্ত্রহীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না, কিন্তু ভারত বা যে কোনো জায়গায় তার বাহিনীর ওপর বড় জৈব বা রাসায়নিক হামলার পর পারমাণবিক প্রত্যাঘাতের বিকল্প রেখে দেয়। এতে ভারত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিদারণযোগ্য পদার্থ চুক্তির আলোচনা আর ‘পারমাণবিক পরীক্ষা নিয়ে স্থগিতাদেশ ধারাবাহিকভাবে মেনে চলার’। এতে স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ডের কমান্ডার-ইন-চিফ নিয়োগ এবং প্রত্যাঘাতের জন্য বিকল্প কমান্ড-শৃঙ্খলাও অনুমোদিত হয়েছে।
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
- Jayita Sarkar, Ploughshares and Swords: India's Nuclear Program in the Global Cold War (Cornell University Press, 2022, open access)
- Nuclear Weapon Archive: Pokhran-I (Smiling Buddha), 18 May 1974
- Nuclear Weapon Archive: Operation Shakti, 1998
- Nuclear Weapon Archive: Real yields of the Indian tests
- National Security Archive, Electronic Briefing Book 412: U.S. Detected Indian Nuclear Test Preparations in 1995, but Photo Evidence was Clear As Mud (22 February 2013)
- National Security Archive, Electronic Briefing Book 467: Declassified Documents Show Henry Kissinger's Major Role in the 1974 Initiative That Created the Nuclear Suppliers Group (21 April 2014)
- Acronym Institute: Statements by India after the tests of 11 and 13 May 1998 (suo motu statement extracts, joint DAE and DRDO statement of 17 May, press conference of 17 May)
- GlobalSecurity.org: Suo Motu Statement by Prime Minister Atal Bihari Vajpayee in Parliament on 27 May 1998
- GlobalSecurity.org: Evolution of India's Nuclear Policy, paper laid before Parliament on 27 May 1998
- Berkeley Seismological Laboratory: India's Nuclear Tests, news reports of 11 to 17 May 1998
- BARC Newsletter No. 178 (November 1998): S K Sikka, Falguni Roy, G J Nair, V G Kolvankar and Anil Kakodkar on the yield of the 11 May 1998 tests
- Siddharth Varadarajan, Fizzle claim for thermonuclear test refuted (The Hindu, 28 August 2009)
- Shakti Sinha, Pokhran anniversary: Vajpayee's secretary recalls the moment of tension and tears on nuclear test day (ThePrint, 11 May 2018)
- Narasimha Rao asked to prepare for nuke tests: Kalam (Governance Now, 6 December 2011)
- Draft Report of the National Security Advisory Board on Indian Nuclear Doctrine, 17 August 1999
- Indian Government statement, The Cabinet Committee on Security Reviews Operationalization of India's Nuclear Doctrine, 4 January 2003 (Acronym Institute reproduction of the MEA text)
- Congressional Research Service, Report 98-486A: Nuclear Sanctions, Section 102(b) of the Arms Export Control Act and Its Application to India and Pakistan (Jeanne J Grimmett, updated 5 October 2001)
- Arms Control Association: U.S. waives many test-related sanctions on India and Pakistan (November 1998)
এই লেখাটি AI সরঞ্জামের সহায়তায় গবেষণা ও রচনা করা হয়েছে এবং নির্ভুলতার জন্য সম্পাদনা করা হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ তথ্য ও আলোচনার জন্য, পেশাদার পরামর্শ নয়। আমাদের সম্পাদকীয় মান ও দাবিত্যাগ দেখুন। কোনো ভুল চোখে পড়ল? আমাদের জানান।
ভালো লাগল? পরেরটিও পড়ুন।
একবারে একটি ভালো লেখা, সরাসরি আপনার ইনবক্সে। কোনো স্প্যাম নয়, যখন খুশি বন্ধ করতে পারেন।