অলঙ্করণ: tuput
বাংলা
ভারতীয় জাতীয় সেনার প্রথম কোর্ট মার্শাল ১৯৪৫ সালের ৫ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ২২ দিন বসেছিল। ভুলাভাই দেশাই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই আইনি দলের, যাতে জওহরলাল নেহরুও ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৩ জানুয়ারি জেনারেল অচিনলেক তিন অফিসারেরই যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের দণ্ড মকুব করেন, আর পরের সন্ধ্যায় দিল্লিতে ১,০০,০০০ জনের বেশি মানুষ তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে জড়ো হন।
ভারতীয় জাতীয় সেনার প্রথম বিচার শুরু হয় ১৯৪৫ সালের ৫ নভেম্বর, সোমবার, সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে, দিল্লির লাল কেল্লার ভেতরের একটি ব্যারাক-কক্ষে। ক্যাপ্টেন শাহ নওয়াজ খান, ক্যাপ্টেন প্রেম কুমার সায়গল আর লেফটেন্যান্ট গুরবক্স সিং ঢিল্লোঁ কাঠগড়ায় দাঁড়ান, অভিযোগ ছিল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর। আদালত শেষবার বসে ৩১ ডিসেম্বর, আর ১৯৪৬ সালের ৩ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার, ভারতের কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল ক্লদ অচিনলেক যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের (দণ্ডিতকে দণ্ডভোগের উপনিবেশে নির্বাসন) দণ্ড মকুব করেন। রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর দোষ প্রমাণিত হলে আইনে এটিই ছিল লঘুতম দণ্ড।
ভারতীয় জাতীয় সেনা (আইএনএ) ছিল সেই বাহিনী, যাকে সুভাষচন্দ্র বসু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার কাহিনি বলা আছে আলাদা একটি লেখায় আর যে সেনাবাহিনী প্রতিটি যুদ্ধে হেরেছিল লেখাটিতে, তাই এই লেখা থাকছে আদালতকক্ষেই। এখানে অনুসরণ করা হয়েছে ইন্ডিয়ান অ্যানুয়াল রেজিস্টারের দিনওয়ারি কার্যবিবরণ (যেখানে সায়গলের বানান সেহগাল), ব্রিটিশ সরকারের প্রকাশিত নথি, হাউস অব কমন্সের দুটি উত্তর আর এই সবকিছু পড়েছেন যে ইতিহাসবিদরা তাঁদের লেখা।
ষাট ফুট লম্বা একটি কক্ষ
পিটার ফে তাঁর দ্য ফরগটন আর্মি বইয়ে লিখেছেন, ছুতোররা একটি ব্যারাক-ভবনের তিনতলার একটি ঘর খালি করেছিল। ঘরটি প্রায় ষাট ফুট লম্বা আর পঁচিশ ফুট চওড়া, আদালতের জন্য একটি নিচু মঞ্চ, আর পরিবার, সাংবাদিক ও অন্যান্য পাসধারীদের জন্য হয়তো ১৫০টি আসন।
বিচার শুরুর এক ঘণ্টা আগে রাস্তার ওপারে ভিড় জমে, হাতে “Save I.N.A. Patriots” আর “Patriots not Traitors” লেখা প্ল্যাকার্ড, পাশ দিয়ে সরকারি গাড়ি গেলে তারা “জয় হিন্দ” বলে চেঁচিয়ে উঠত। ভেতরে সভাপতিত্ব করেন মেজর-জেনারেল এ. বি. ব্লাক্সল্যান্ড, জজ-অ্যাডভোকেট ছিলেন কর্নেল কেরিন, অর্থাৎ যে অফিসার কোর্ট মার্শালকে আইনের বিষয়ে পরামর্শ দেন। অভিযুক্তরা পরেছিলেন পদমর্যাদার চিহ্নহীন উর্দি, আর বসতে বলা হলে তাঁরা আগে ঘুরে নেহরুকে সামরিক অভিবাদন জানান।
তিনজনের বিরুদ্ধেই ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১ ধারায় রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর অভিযোগ ছিল। ঢিল্লোঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত খুনের অভিযোগও ছিল, ১৯৪৫ সালের ৬ মার্চ বা তার কাছাকাছি সময়ে বার্মায় পোপা পাহাড়ের কাছে চারজনকে গুলি করার জন্য। সায়গলের বিরুদ্ধে ছিল সেই হত্যায় সহায়তার অভিযোগ, আর শাহ নওয়াজের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ হুসেন নামে এক গোলন্দাজকে গুলি করায় সহায়তার। তিনজনই নিজেদের নির্দোষ বলেন।
তেরোজন আইনজীবী, আর দর্শকাসনে একজন বিচারক
১৯৪৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি একটি প্রতিরক্ষা কমিটির নাম ঘোষণা করে, আর ব্রিটিশ সরকারের নথিতে তার সদস্যদের নাম ছাপা আছে: তেজ বাহাদুর সাপ্রু, জওহরলাল নেহরু, ভুলাভাই দেশাই, কে. এন. কাটজু, রঘুনন্দন সরণ, বদ্রীদাস আর আসফ আলি, যিনি ছিলেন তার আহ্বায়ক। প্রথম সকালে রেজিস্টার নেহরুকে দেখেছিল প্রতিরক্ষার টেবিলে ব্যারিস্টারের গাউন পরা অবস্থায়, ২২ বছরের মধ্যে প্রথমবার সেটি গায়ে চাপিয়ে। সুমিত সরকার ব্যবধানটি ধরেছেন ২৫ বছর।
বিচার শুরুর সময় তোলা ছবিতে ফে তেরোজন আইনজীবী গুনেছেন। তিনি সায়গলের বাবা আচ্ছ্রু রামকে, লাহোর হাইকোর্টের কর্মরত বিচারপতিকে, প্রতিরক্ষাকে একসূত্রে ধরে রাখার কৃতিত্ব দিয়েছেন। শাহ নওয়াজের নিকটতম আত্মীয় ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার-মেজর আর ঢিল্লোঁর বাবা ছিলেন কৃষক, তাই আচ্ছ্রু রাম জোর দিয়েছিলেন যে তিনজনের হয়ে একসঙ্গে লড়তে হবে। কর্মরত বিচারপতি আইনজীবীদের সঙ্গে বসতে পারতেন না, তাই প্রথম দিন তিনি বসেছিলেন দর্শকদের সঙ্গে। পরদিন সকালে আদালতের সভাপতির একটি চিঠিতে তিনি প্রতিরক্ষা দলে যোগ দিতে পারেন।
দেশাই, বয়স ৬৮ আর স্বাস্থ্য খারাপ, আদালতকক্ষের দায়িত্ব নেন। উদ্বোধনের দিনেই তিনি তিন সপ্তাহ মুলতুবি চান, কারণ তাঁর তালিকাভুক্ত ১১২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮০-র বেশি জনের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। প্রসিকিউশনের নেতৃত্বে থাকা অ্যাডভোকেট-জেনারেল স্যর নওশিরওয়ান ইঞ্জিনিয়ার আপত্তি করেননি, তবে চেয়েছিলেন আগে নিজের মামলা শুরু করতে। তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্য আর একজন সাক্ষীর পর আদালত ২১ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতুবি হয়।
সাক্ষীরা, আর ৭ ডিসেম্বরের তিনটি বিবৃতি
ইঞ্জিনিয়ার আদালতকে বলেন, যুদ্ধ চালানোর উদ্দেশ্য দেশপ্রেম হোক বা ভাড়াটে সৈনিকের, তাতে কিছু আসে যায় না, আর একজন অফিসারের রাজার প্রতি আনুগত্য যেখানেই থাকুন বহাল থাকে, যুদ্ধবন্দি হলেও। তাঁর প্রথম সাক্ষী লেফটেন্যান্ট ডি. সি. নাগ ছিলেন একজন প্রাক্তন দেওয়ানি ম্যাজিস্ট্রেট, যিনি ভারতীয় সেনা আইনের আদলে আইএনএ-র নিজস্ব আইন লিখেছিলেন। নাগ প্রায় সত্তরটি আটক করা কাগজপত্র শনাক্ত করেন, তার মধ্যে ছিল নির্দেশ, ডায়েরি আর পরিস্থিতির প্রতিবেদন। ফে বলেছেন, দৈনিক সংবাদপত্রে ছাপা সেই কাগজপত্র আইএনএ আসলে কী করেছিল তার একটি জানালা খুলে দিয়েছিল।
এরপর সাক্ষীরা বর্ণনা করেন আইএনএ-তে যোগ দিতে অস্বীকার করা যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে কেমন আচরণ হয়েছিল। ফে জানান, এর কিছুই তিন অভিযুক্তকে স্পর্শ করেনি, আর কর্নেল কেরিন আদালতকে বলেছিলেন যে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে বন্দিদের ওপর নির্যাতন করেছেন, এমন কথা কেউ কখনও বলেনি।
প্রসিকিউশনের কয়েকজন সাক্ষী প্রতিরক্ষাকে সাহায্য করেন। ৭ ডিসেম্বর জাভা থেকে উড়িয়ে আনা এক গুর্খা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক কর্নেল কিটসন ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইরাবতীর তীরে সায়গলের আত্মসমর্পণের বর্ণনা দেন। কিটসন বলেন, সায়গল তাঁকে বলেছিলেন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ব্যবস্থা তাঁর পছন্দ নয় আর এখন হেরে গিয়ে তিনি “পরিণতি মেনে নিতে প্রস্তুত।” দেশাই প্রতিরক্ষার পক্ষে মোট সাক্ষী ডেকেছিলেন মাত্র এগারোজন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল প্রসিকিউশনের ২৮ জন সাক্ষীই তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে দিয়েছে।
সেদিন প্রত্যেক অভিযুক্ত একটি লিখিত বিবৃতি পড়েন। শাহ নওয়াজ বলেন, তিনি আজাদ হিন্দ অস্থায়ী সরকারের বাহিনীর সদস্য হিসেবে লড়েছেন। তিনি আদালতকে জানান, ১৯৪৪ সালে চিন পাহাড়ে দুই মাস তিনি নিজের এক জ্ঞাতিভাইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর বাবা ৩৯ বছর ভারতীয় সেনায় কাজ করেছেন, আর তাঁর পরিবারের প্রায় ৮০ জন সদস্য সেখানে অফিসার হিসেবে আছেন। ঢিল্লোঁ দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমির চেটউড হলে খোদাই করা সেই মন্ত্রটির কথা মনে করিয়ে দেন, যার শুরু: “তোমার দেশের সম্মান, কল্যাণ ও নিরাপত্তা সবার আগে, সর্বদা, প্রতিবার।” ফে লিখেছেন, দ্য হিন্দু বিবৃতিগুলো বিস্তারিত ছেপেছিল।
দেশাইয়ের দুই দিন, ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর
কোনো নোট ছাড়াই বলতে গিয়ে দেশাই শুরু করেন এই যুক্তি দিয়ে যে অভিযোগটিই অন্য পক্ষকে স্বীকৃতি দেয়। আদালত যদি মেনে নেয় যে একটি যুদ্ধ চালানো হয়েছিল, তিনি বলেন, তাহলে সেই যুদ্ধ চালানো একটি সরকারকেও মেনে নিয়েছে, আর তার অর্থ আইএনএ-র জন্য যুদ্ধরত পক্ষের অধিকার, অর্থাৎ বৈধ যুদ্ধে সৈনিকদের রক্ষাকবচ। “আইনগত আনুগত্য চিরকালের বিষয় হতে পারে না,” তিনি আদালতকে বলেন, আর তাঁর মতে যে অধীন জাতি তা কখনও ঝেড়ে ফেলতে পারে না, সে কখনও স্বাধীন হবে না।
এরপর দেশাই গুনে গুনে বলেন সেই সরকারের হাতে কী ছিল। জাপান আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ হস্তান্তর করেছিল, যার নাম আইএনএ দিয়েছিল শহিদ ও স্বরাজ, আর আইএনএ মণিপুর ও বিষ্ণুপুরের প্রায় ১,৫০০ বর্গমাইল চার থেকে ছয় মাস শাসন করেছিল। তারপর আসে ১৯৪৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের একটি বিবিসি সম্প্রচার, যা তিনি পড়ে শোনান, তাতে জেনারেল আইজেনহাওয়ারের ঘোষণা ছিল যে ফরাসি অভ্যন্তরীণ বাহিনী একটি যুদ্ধরত বাহিনী, আর বার্লিন রেডিওর জবাব ছিল যে ওই গেরিলারা বিদ্রোহী। ভারতীয় দণ্ডবিধিতে, তিনি যোগ করেন, রাষ্ট্রদ্রোহ নামে কোনো অপরাধই নেই।
খুনের অভিযোগ নিয়ে তিনি সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে যুক্তি দেন। সাক্ষীদের কেউই চারজনকে নাম ধরে শনাক্ত করেননি, আর ঢিল্লোঁ বলেন, কথিত নির্দেশের দিন তিনি বিছানায় ছিলেন, নড়াচড়ার অবস্থায় ছিলেন না। পদ্ধতির প্রশ্নে দেশাই বলেন, প্রাদেশিক সরকারের অভিযোগ ছাড়া কোর্ট মার্শাল এই অপরাধের বিচার করতে পারে না। শেষে তিনি বিচারটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে ঘোষণা করেন।
ইঞ্জিনিয়ার জবাব দেন ২২ ডিসেম্বর। দেশপ্রেমের উদ্দেশ্য কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন নয়, তিনি বলেন, যদিও দণ্ড ঠিক করার সময় তা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। আদালত দেশাইকে দ্বিতীয়বার বক্তব্য রাখতে দেয়নি। শনিবার ২৯ ডিসেম্বর এল জজ-অ্যাডভোকেটের সারসংক্ষেপ, যা প্রতিটি অভিযোগের প্রতিটি অংশ প্রমাণের দায় চাপাল প্রসিকিউশনের ওপর। সোমবার ৩১ ডিসেম্বর আদালত ২০ মিনিট বসে সমাপ্ত হয়।
তিনটি রায় আর একটি দণ্ড মকুব
রায় আসে ১৯৪৬ সালের ৩ জানুয়ারি। তিনজনই রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোয় দোষী সাব্যস্ত হন। শাহ নওয়াজ খুনে সহায়তার দায়েও দোষী হন। ঢিল্লোঁ খুনের অভিযোগ থেকে এবং সায়গল সহায়তার অভিযোগ থেকে খালাস পান, ফে এই ফলাফলের কারণ খুঁজে পেয়েছেন সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে আচ্ছ্রু রামের পাঠে: গুলি চালানো হয়েছিল একটি সরু খাদে বলে বলা হয়েছিল, আর সাক্ষীরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখান থেকে কী দেখতে পারতেন তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। এই যুক্তি শাহ নওয়াজের কাজে লাগেনি, কারণ মোহাম্মদ হুসেনকে গুলি করার ঘটনা ঘটেছিল ভিন্ন পরিস্থিতিতে।
তিনজনকে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোয় দোষী পেয়ে আদালত, সরকারি বিজ্ঞপ্তি বলছে, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের একটি দিতে বাধ্য ছিল, আর সে দ্বিতীয়টি দেয়, সঙ্গে ক্যাশিয়ারিং (অসম্মানজনক বরখাস্ত) আর বকেয়া বেতন বাজেয়াপ্তি। অচিনলেক রায় অনুমোদন করেন, কিন্তু, বিজ্ঞপ্তি বলছে, তিনজনেরই দ্বীপান্তর মকুব করেন। নীতি ছিল শুধু তাদেরই বিচার করা, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর পাশাপাশি চরম নিষ্ঠুরতার অভিযোগ আছে, আর ঢিল্লোঁ ও সায়গল সেই ধরনের অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছিলেন। শাহ নওয়াজের বিরুদ্ধে প্রমাণিত কাজগুলো যতই কঠোর হোক, বিজ্ঞপ্তি যোগ করে, প্রচলিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ক্যাশিয়ারিং বহাল থাকে।
একটি নজির ছিল ওই কেল্লাতেই। ফে লিখেছেন, শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের বিচার হয়েছিল সেখানেই, ১৮৫৮ সালে, আর তাঁর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে এক অফিসার তিনজনকে জানান যে তাঁরা যেতে পারেন।
দিল্লিতে এক লক্ষ মানুষ, লাহোরের পথে রাতের ট্রেন
১৯৪৬ সালের ৪ জানুয়ারি, শুক্রবার, দিল্লির গান্ধী গ্রাউন্ডে আসফ আলির সভাপতিত্বে একটি সমাবেশে ফে-র হিসাবে ১,০০,০০০ জনের বেশি মানুষ জড়ো হন, আর সেই রাতেই তিনজন ফ্রন্টিয়ার মেলে লাহোরের পথে রওনা দেন। প্রতিটি স্টেশনে ভিড় ট্রেন আটকে রাখত, যতক্ষণ না তারা তাঁদের দেখতে পেত। ৫ জানুয়ারি, শনিবার, লাহোরে শহরের সিনিয়র সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিস জন পার্সিভাল মর্টন একটি টাইপ করা স্মৃতিকথায় মনে করেছেন, বড় জমায়েতের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার চেষ্টার বদলে তিনি নিজের পুলিশকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এক তরুণী তিন জনের কপালে নিজের রক্তে তৈরি তিলক পরিয়ে দেন।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে জনমনের অনুভূতি মেপেছিলেন। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর স্যর নর্মান স্মিথ ২০ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে লেখেন, “ভারতীয় জনসাধারণের এত আগ্রহ আর, নির্ভয়ে বলা যায়, সহানুভূতি টেনেছে, এমন বিষয় কমই হয়েছে।” ৫ নভেম্বর লাহোর হরতালে (দোকানপাট ও কাজকর্ম বন্ধ) থেমে যায়। বিপন চন্দ্র ও তাঁর সহলেখকরা আইএনএ-র লক্ষ্যকে কমবেশি সমর্থন করা পক্ষগুলোর মধ্যে মুসলিম লিগ, কমিউনিস্ট পার্টি, অকালি আর হিন্দু মহাসভার নাম করেছেন।
রাস্তায় মৃত্যুও হয়েছিল। কলকাতায় রেজিস্টার নথিভুক্ত করেছে ২১ নভেম্বর দুজনের মৃত্যু, পুলিশ একটি ছাত্র মিছিল থামানোর পর, আর পরদিন পুলিশের গুলিতে ১৫ জন নিহত।
দণ্ড কেন মকুব হয়েছিল
ব্রিটিশ নথি দেখায়, নভেম্বরেই দণ্ড লঘু করার কথা ভাবা হচ্ছিল। ১৭ নভেম্বরের একটি পাঞ্জাব সরকারি নোট, যা অচিনলেক ভাইসরয়কে লেখা একটি চিঠির সঙ্গে জুড়ে দেন, সতর্ক করেছিল যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে “অভূতপূর্ব আন্দোলন” হবে আর “আইএনএ জনপ্রিয় বীর, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ কেবল তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াবে।”
৩০ নভেম্বর ভারত সরকার লন্ডনে তার করে জানায়, পুরোনো নীতি চালিয়ে গেলে ২০০ থেকে ৩০০টি বিচার আর হয়তো ৪০ বা ৫০টি মৃত্যুদণ্ড হত। তার সিদ্ধান্ত: “বিমূর্ত ন্যায়কে কিছুটা হলেও সুবিধাবাদের কাছে হার মানতে হবে।” সঙ্গে যোগ করা হয়, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অধিকাংশের মত এখন নমনীয়তার পক্ষে, আর বিচারের সংখ্যা কমিয়ে ২০ থেকে ৫০ করা হবে, শুধু নিষ্ঠুরতা ও খুনের মামলায়।
৩ ডিসেম্বর কমন্সে আন্ডার-সেক্রেটারি অব স্টেট এ. হেন্ডারসন বলেন, প্রায় ৪৩,০০০ জন নথিভুক্ত বা জড়িত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ভারতীয় সেনার মাত্র ২০,০০০ জন, আর দেশকে মুক্ত করতে সাহায্য করছেন এই ভুল বিশ্বাসে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের বিচার করা হবে না।
অচিনলেক ১৯৪৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির একটি গোপন চিঠিতে নিজের কমান্ডারদের কাছে ব্যাখ্যা দেন, চিঠির প্রতিলিপি যায় ওয়াভেলকেও। বেশিরভাগ ভারতীয় অফিসার, তিনি লিখেছেন, অপরাধের গুরুত্ব মেনেছিলেন, কিন্তু প্রায় সবাই নিশ্চিত ছিলেন যে দণ্ড কার্যকর করলে “সারা দেশে বিশৃঙ্খলা” দেখা দিত। তিনি আরও লিখেছেন: “নুনের মর্যাদা বোঝে এমন যেকোনো ভারতীয় অফিসারই জাতীয়তাবাদী।“
পরের বিচারগুলো, আর ইতিহাসবিদরা কোথায় ভিন্নমত
ফে বলেছেন, পরের কোর্ট মার্শালগুলো জনসাধারণের চোখের আড়ালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন আবদুল রশিদ, পাঁচটি অভিযোগে দোষী, তার দুটি বন্দিদের মারধরের জন্য, ৪ ফেব্রুয়ারি অচিনলেকের সিদ্ধান্তের পর সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পান, আর চন্দ্র ও তাঁর সহলেখকদের বিবরণে মুসলিম লিগের ছাত্ররা ১১ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় তার বিরুদ্ধে মিছিল করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি হেন্ডারসন কমন্সে জানান, চরম নিষ্ঠুরতার জন্য আরও প্রায় ২০ জনের বিচার হবে। ফে-র মতে, ১৯৪৬ সালের মে মাসের শুরুতে একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বিচারগুলো শেষ করা হয়।
সায়গল ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন লক্ষ্মীকে লাহোরে ১৯৪৭ সালের মার্চে বিয়ে করেন, আর তাঁরা কানপুরে থিতু হন, ফে লিখেছেন। শাহ নওয়াজ পরে লোকসভার সদস্য হন। ফে-র বিচারে, স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীতে আইএনএ অফিসারদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো গুরুতর সম্ভাবনা ছিল না।
বিচারের প্রভাব ইতিহাসবিদরা ভিন্নভাবে মাপেন। সুমিত সরকার লাল কেল্লা বাছাই আর একই কাঠগড়ায় একজন হিন্দু, একজন মুসলমান ও একজন শিখকে রাখাকে জোড়া বোকামি বলেছেন, আর আইএনএ-র অভিজ্ঞতা এবং ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারির বোম্বে নৌ-ধর্মঘটে পরিণত হওয়া সেনাদের অসন্তোষের মধ্যে সম্ভাব্য যোগ দেখেন, যা “খুব সম্ভবত দ্রুত সরে যাওয়ার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের পেছনে একক সবচেয়ে নির্ণায়ক কারণ।” ফে বলেছেন, স্থান বাছাই ছিল বাস্তবিক সিদ্ধান্ত, কোনো ইঙ্গিত নয়, কারণ তিনজন হাতের কাছেই ছিলেন, আর সেনা ও বিচারগুলো ব্রিটেনের চলে যাওয়ার ইচ্ছাকে “একটি শক্তিশালী, হয়তো নির্ণায়ক, ধাক্কা” দিয়েছিল। চন্দ্র ও তাঁর সহলেখকরা বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল অপ্রত্যাশিতভাবে সহানুভূতিশীল, যা সরকারি বিশ্বাসের উল্টো, যে অনুগত সৈনিকরা আইএনএ-র প্রতি বিরূপ। নৌ-বিদ্রোহের কথা বলা আছে আলাদা একটি লেখায়, আর সৈনিকদের আনুগত্য নিয়ে ব্রিটিশ নথিগুলো সাজানো আছে শুধু অহিংসাই কি ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল? লেখায়।
২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লার ব্যারাকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আইএনএ-কে নিয়ে একটি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন এবং, প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর বিবরণ অনুযায়ী, বলেন যে “ঠিক এই ভবনেই” সায়গল, ঢিল্লোঁ ও শাহ নওয়াজ খানের বিচার হয়েছিল। কেল্লার ক্রান্তি মন্দির চত্বরের চারটি জাদুঘরের এটি একটি।
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
- Indian Annual Register, 1945, July to December, Vol. II (day-by-day report of the first INA court martial, 5 November to 31 December 1945), Internet Archive
- Indian Annual Register, 1946, January to June, Vol. I (the Rashid sentence, the Government's statement and the Calcutta disturbances of February 1946), Internet Archive
- Nicholas Mansergh (ed.), The Transfer of Power 1942 to 1947, Vol. VI: The Post-War Phase, 1 August 1945 to 22 March 1946 (HMSO, 1976), Internet Archive
- Hansard, House of Commons written answer, 3 December 1945: Indian National Army, Mr. A. Henderson
- Hansard, House of Commons written answer, 18 February 1946: Indian National Army (Trials), Mr. A. Henderson
- Press Information Bureau, Prime Minister's Office, 23 January 2019: PM inaugurates Subhas Chandra Bose Museum at Red Fort
- Peter Ward Fay, The Forgotten Army: India's Armed Struggle for Independence, 1942 to 1945 (University of Michigan Press, 1993), Internet Archive
- Sumit Sarkar, Modern India, 1885 to 1947, Internet Archive
- Bipan Chandra and others, India's Struggle for Independence (Penguin, 1989), chapter 36, Internet Archive
এই লেখাটি AI সরঞ্জামের সহায়তায় গবেষণা ও রচনা করা হয়েছে এবং নির্ভুলতার জন্য সম্পাদনা করা হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ তথ্য ও আলোচনার জন্য, পেশাদার পরামর্শ নয়। আমাদের সম্পাদকীয় মান ও দাবিত্যাগ দেখুন। কোনো ভুল চোখে পড়ল? আমাদের জানান।
ভালো লাগল? পরেরটিও পড়ুন।
একবারে একটি ভালো লেখা, সরাসরি আপনার ইনবক্সে। কোনো স্প্যাম নয়, যখন খুশি বন্ধ করতে পারেন।